রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাত শুধু ইতিহাস নয়। তাঁর জীবন আমাদের জন্য আদর্শ। তিনি মানুষকে তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছেন। সত্য ও আমানতদারির শিক্ষা দিয়েছেন। ন্যায় ও ইনসাফের শিক্ষা দিয়েছেন। জুলুম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি দুর্বল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। এতিম, মিসকিন ও অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রতিবেশীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। নারীর মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করেছেন।
মদিনায় তিনি একটি সুসংগঠিত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ ছিল। তাদের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারিত ছিল। মদিনার সনদ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি ন্যায়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। ক্ষমতাকে ভোগের বিষয় করেননি। ক্ষমতাকে আমানত হিসেবে দেখেছেন। মানুষের অধিকার রক্ষাকে দায়িত্ব মনে করেছেন।
বিচারের ক্ষেত্রে তিনি পক্ষপাত করেননি। আপনজনের জন্যও আলাদা আইন রাখেননি। ধনী-গরিব সবার জন্য ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বিদায় হজের ভাষণেও এসেছে মানুষের অধিকারের কথা। এসেছে জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার কথা। এসেছে নারীর অধিকারের কথা। এসেছে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের কথা।
আজকের বাংলাদেশেও এই শিক্ষাগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট ও মানুষের অধিকার নিয়ে নানা প্রশ্নের পর দেশ রাষ্ট্র সংস্কারের পথে এগিয়েছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানও মানুষের ন্যায়, অধিকার ও জবাবদিহির আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছে। এরপর রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধু সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন দরকার। ক্ষমতা যেন কারও ব্যক্তিগত সম্পদ না হয়। রাষ্ট্র যেন কোনো দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়। জনগণের অধিকার যেন ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকে।
সীরাত আমাদের শেখায়, ক্ষমতা একটি আমানত। নেতৃত্ব একটি দায়িত্ব। মানুষের অধিকার রক্ষা করা কর্তব্য। আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো ঈমানি চেতনার অংশ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাই প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার চাই। দখলের পরিবর্তে জবাবদিহি চাই। বৈষম্যের পরিবর্তে সমঅধিকার চাই। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রাষ্ট্র সংস্কারও হতে হবে মানুষের অধিকার ও কল্যাণকে সামনে রেখে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার, জবাবদিহি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ—এসব শুধু সাংবিধানিক বিষয় নয়। এগুলো একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত।
তাই সীরাত শুধু আলোচনা করার বিষয় নয়। সীরাত জীবনে ধারণ করার বিষয়। ব্যক্তিজীবনে চাই সততা। পরিবারে চাই দায়িত্ববোধ। সমাজে চাই ন্যায় ও সহমর্মিতা। রাষ্ট্রে চাই জবাবদিহি ও ইনসাফ।
ব্যক্তি থেকে পরিবার। পরিবার থেকে সমাজ। সমাজ থেকে রাষ্ট্র। সবখানে প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিকতা। সিরাতের আলোয় আলোকিত হোক আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ বুঝে তা অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: শাইখুল হাদিস ও আমির, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
