ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালা থেকে পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর জেনারেল ও দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রবক্তা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ও অপসারণ করে আলোচনায় এসেছেন আবু তৈয়ব হাবিলদার। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে তার এ কর্মকাণ্ড ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা। কেউ তাকে বাহবা দিচ্ছেন, আবার কেউ করছেন তিরস্কার।
এমন বিতর্কের মধ্যেই আবু তৈয়ব হাবিলদারের অতীত ও ডাকসু নির্বাচনে তার অংশগ্রহণের তথ্যও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে তিনি ইতিহাসের অংশ হতে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ভিপি প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ১০ ভোট।
জানা গেছে, আবু তৈয়ব হাবিলদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী। রাজনৈতিকসহ নানা জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন তার শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয় বলে তিনি এর আগে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় পর নানা বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে তিনি সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী হন। ওই নির্বাচনে ৪৫ জন শিক্ষার্থী ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে সাদিক কায়েম রেকর্ডসংখ্যক ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ছাত্রদলের প্রার্থী মো. আবিদুল ইসলাম খান ৫ হাজার ৭০৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন।
ডাকসু নির্বাচন পোর্টাল-২০২৫-এর ফলাফল অনুযায়ী, আবু তৈয়ব হাবিলদার ভিপি পদে পেয়েছিলেন মোট ১০ ভোট। ফলে বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর মধ্যে তার অবস্থান ছিল তলানিতে। তবে নির্বাচনের আগে আবু তৈয়ব জানিয়েছিলেন, জয়-পরাজয় নয়, ইতিহাসের অংশ হওয়া এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
২০২৫ সালের ২০ আগস্ট নিজের ফেসবুক পোস্টে আবু তৈয়ব লিখেছিলেন, তিনি ১/১১-এর সময় ‘স্বৈরাচার’ ম ইউ আহমেদকে হঠাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন। তার দাবি, ২০০৯ সালে ছাত্রলীগের নির্মমতার শিকার হয়ে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। এতে তার শিক্ষাজীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে এবং পড়ালেখা শেষ করতে না পারায় তিনি বিসিএসে অংশ নিতে পারেননি কিংবা কোনো চাকরির সুযোগও পাননি।
ওই পোস্টে তিনি আরও লিখেছিলেন, বিগত ১৬ বছরে ছাত্রলীগের নির্যাতন-নিপীড়ন ও নির্মমতার শিকার অনেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে পুনর্ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনি ও আরও একজন রয়েছেন। এর মাধ্যমে নিয়মিত ছাত্র হিসেবে ক্লাস ও পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষাজীবনের ইতি টানার আশা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণ ব্যাখ্যা করে আবু তৈয়ব বলেছিলেন, ‘এখানে জেতা-হারার বিষয় নেই। গণতন্ত্রের বিকাশে অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে দাঁড়ানো তার অধিকার এবং শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। এমনকি তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে ভোট না চেয়ে বড় ভাই হিসেবে ভালোবাসা চেয়েছিলেন।
ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ছেঁড়া ও অপসারণের ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি। ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে কেউ তার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করছেন, অন্যদিকে কেউ এটিকে সংগ্রহশালার নিদর্শন অপসারণ বা ক্ষতিসাধন হিসেবে দেখছেন।
ফলে একদিকে ডাকসু সংগ্রহশালার জিন্নাহর ছবি ছেঁড়ার ঘটনা, অন্যদিকে ডাকসু নির্বাচনে তার ব্যতিক্রমী প্রার্থিতা- দুই বিষয় মিলিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন আবু তৈয়ব হাবিলদার।
ওবায়দুল কাদের-সাদ্দামসহ ৭জনের মৃত্যুদণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্যরা হলেন—আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
মামলার রায়ে দণ্ডিত সাত আসামির সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, এ মামলার তদন্তকাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৮ জুন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে একই বছরের সাত ডিসেম্বর প্রতিবেদন জমা দেন কর্মকর্তারা। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে দাখিল করা হয়।
একই দিন অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২। ধাপে ধাপে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি, স্টেট ডিফেন্স নিয়োগসহ শুনানি শেষে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু হয়।
তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট সাক্ষ্য দিয়েছেন ২৯ জন। এর মধ্যে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিও রয়েছে। সবমিলিয়ে দুই আগস্ট সাক্ষ্যপর্ব সম্পন্ন হয়। এর দুই দিন পর চার আগস্ট থেকেই যুক্তিতর্ক শুরু করে প্রসিকিউশন। ৯ কার্যদিবসে প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্সের এ ধাপ শেষ হয় ১৭ আগস্ট। আর ওই দিনই রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। রায় ঘোষণার তারিখ দেওয়া হয় ১৫ সেপ্টেম্বর। এ মামলায় মোট ১২৩ সিরিজ ডকুমেন্টস প্রদর্শন করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আহবান জানানোসহ একাধিক বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা করেন। কোথাও কোথাও সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতা সংঘটিত হয়, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য।
