জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনে দেখা গেছে ভিন্নধর্মী চিত্র। মাঠে বিএনপি নেতাকর্মীরা দিনভর ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালালেও বহু আসনে ব্যালট বাক্সে এগিয়ে গেছে ‘হ্যাঁ’ ভোট। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-৮, চট্টগ্রাম-১৩ ও চট্টগ্রাম-১৬ আসনে এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ করা গেছে।
বিএনপির এক প্রভাবশালী জেলা নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এলাকা, বাজার ও গ্রামগঞ্জে ‘না’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। সাধারণ ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে ‘হ্যাঁ’ ভোট গণতন্ত্রকে বিকৃত করতে পারে। তবে চূড়ান্ত ফলাফলে সেই প্রচেষ্টার প্রতিফলন প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যায়নি।
ভোটারদের একাংশের মতে, মাঠে নেতাদের সক্রিয় উপস্থিতি থাকলেও ভোটকেন্দ্রে গিয়ে অনেকে নিজস্ব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ এমন ছবিও শেয়ার করেছেন, যেখানে দেখা গেছে—প্রার্থীকে সমর্থন করলেও গণভোটে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
চট্টগ্রাম-৮ আসনের এক ভোটার মোহাম্মদ শাহিন বলেন, “শুরুতে ‘না’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও কেন্দ্রে গিয়ে বিভ্রান্তিকর ও প্রভাবময় পরিবেশের মুখোমুখি হন।” শেষ পর্যন্ত ‘হ্যাঁ’ ভোটের চাপই বেশি অনুভূত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চট্টগ্রাম-১৩ আসনের ভোটার নূরুল আমিন জানান, বিএনপি নেতারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘না’ ভোটের প্রচারণা চালিয়েছেন। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যাই বেশি।
বিভিন্ন আসনের সংক্ষিপ্ত ফলাফল
চট্টগ্রামের অধিকাংশ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। তবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের ফলাফল ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই): নুরুল আমিন বেসরকারিভাবে নির্বাচিত। ‘হ্যাঁ’ ১,১৮,১৯৮; ‘না’ ৮৮,৪৯০।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি): সরওয়ার আলমগীর জয়ী। ‘হ্যাঁ’ ১,১৫,২৮৯; ‘না’ ৮৮,১০৩।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ): মোস্তফা কামাল পাশা বিজয়ী; এখানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী।
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড): আসলাম চৌধুরীর ফল স্থগিত; ‘হ্যাঁ’ জয়ী।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী): ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জয়ী। ‘হ্যাঁ’ ১,২০,১৮২; ‘না’ ৮৫,৬২২।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান): গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বিজয়ী; ‘হ্যাঁ’ জয়ী।
চট্টগ্রাম-৭: হুম্মাম কাদের চৌধুরী জয়ী। ‘হ্যাঁ’ ৯৭,১৮৫; ‘না’ ৬৭,৩৭৮।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া): মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান জয়ী। ‘হ্যাঁ’ ৯৩,১৯১; ‘না’ ৭৪,২৪৫।
চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-পাহাড়তলী): সাঈদ আল নোমান জয়ী। ‘হ্যাঁ’ ১,৩২,১০০; ‘না’ ৭১,৩৩৯।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা): আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জয়ী। ‘হ্যাঁ’ ১,২৮,৮৯৮; ‘না’ ৬৮,০৭০।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া): মো. এনামুল হক জয়ী। ‘হ্যাঁ’ ১,২৬,৮১৪; ‘না’ ৫৭,৩১৩।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী): সরওয়ার জামাল নিজাম জয়ী; এখানে ‘না’ ১,২৪,৬২৯ এবং ‘হ্যাঁ’ ৮০,৫৮০।
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক): জসিম উদ্দীন আহমেদ ১,০২৬ ভোটে জয়ী; ‘হ্যাঁ’ জয়ী।
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া): জামায়াত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী জয়ী; ‘হ্যাঁ’ জয়ী।
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী): দাঁড়িপাল্লার মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ৯৩,১৬৭ ভোট পান। ধানের শীষের মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পরাজিত। এখানে ‘হ্যাঁ’ ১,৩৬,৮৪০; ‘না’ ৮৯,৩২৩।
মাঠের প্রচারণা ও ভোটকেন্দ্রের ফলাফলের এই পার্থক্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে ধারণা করা হচ্ছে, দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে অনেক ভোটার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে প্রচারে দৃশ্যমান প্রভাব থাকলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রবাহ বহু আসনে থামানো যায়নি।
এমএআর/
