আজহারী ও শায়খ আহমাদুল্লাহর অস্ট্রেলিয়ার ভিসা বাতিলের নেপথ্য কারণ কী?

by hsnalmahmud@gmail.com

আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ >>

বাংলাদেশের দুই জনপ্রিয় ইসলামি স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ ও ড. মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী। দেশ-বিদেশে তাদের বিপুল অনুসারী রয়েছে। ইসলামি দাওয়াহ, ওয়াজ-মাহফিল ও বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনে তাদের বক্তব্য শুনতে হাজারো মানুষ ভিড় করেন। তবে সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ভিসা বাতিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন তারা দুজনই।

বিজ্ঞাপন
banner

অস্ট্রেলিয়া সরকার অভিযোগ করেছে, তাদের কিছু পূর্বের বক্তব্যে ইহুদিবিদ্বেষী ও উসকানিমূলক মন্তব্য রয়েছে, যা দেশটির সামাজিক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এ কারণেই মাইগ্রেশন আইনের আওতায় দুজনের ভিসা বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—কোন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, কী ছিল নেপথ্য কারণ, এবং এই ঘটনায় কী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক মহল ও গণমাধ্যম?

ইহুদি বিদ্বেষী ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারীর পর এবার আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া। শায়খ আহমাদুল্লাহর সিডনিতে একটি অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও বিতর্কের মুখে তিনি আগেই অস্ট্রেলিয়া ত্যাগ করেন। তার দেশ ছাড়ার পরই ভিসা বাতিলের খবরটি নিশ্চিত করেছে অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম দ্য সানডে টেলিগ্রাফ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (৬ এপ্রিল) ক্যানবেরা, শুক্রবার অ্যাডিলেড এবং শনিবার পার্থে শায়খ আহমাদুল্লাহর পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। ভিসা বাতিল হওয়ায় এসব সফর স্থগিত করা হয়েছে।

টেলিগ্রাফের দাবি অনুযায়ী, শায়খ আহমাদুল্লাহ সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া সফরকালে সিডনিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগের কিছু ভিডিও বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর বিতর্ক শুরু হয়। একটি ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘একজন পণ্ডিত একবার বলেছিলেন… এমনকি যদি দুটি মাছও মারামারি করে, তবে বুঝতে হবে এর পেছনে ইহুদিদের ষড়যন্ত্র রয়েছে। তারা এতটাই জঘন্য… পৃথিবীর যত অশান্তি, তার নেপথ্য কারিগর হলো তারা।’

অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ম্যাট থিসলেথওয়েট স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যারা ইহুদিবিদ্বেষী বা ইসলামফোবিক (ইসলামবিদ্বেষী) মতাদর্শ ছড়ায়, তাদের প্রতি আমাদের কোনো সহনশীলতা নেই। মাইগ্রেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী আমাদের এই ধরনের ভিসা বাতিলের ক্ষমতা রয়েছে।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এর আগে অপর বাংলাদেশি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীর ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

উল্লেখ্য, শায়খ আহমাদুল্লাহর আগে বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার ও আলোচক ড. মিজানুর রহমান আজহারীকে সফরের মাঝপথেই ভিসা বাতিল করে দেশ ছাড়তে বলে অস্ট্রেলিয়া। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ডেইলি মেইল জানিয়েছে, ইহুদিবিরোধী মন্তব্য এবং অ্যাডলফ হিটলারকে ‘ঈশ্বরের শাস্তি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তিনি ইহুদিদের ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী’, ‘বিষাক্ত কলঙ্ক’ এবং এইডসের মতো রোগের জন্য দায়ী করেছিলেন। এছাড়া ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া এক বক্তব্যে আজহারী ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তুলে ধরেন এবং হলোকাস্ট নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আজহারী ‘লিগ্যাসি অব ফেইথ’ শীর্ষক সিরিজে অংশ নিতে ব্রিসবেন, মেলবোর্ন, সিডনি ও ক্যানবেরায় সফর করার কথা ছিল। তবে ভিসা বাতিল হওয়ায় সফর অসম্পূর্ণ রেখে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার লিবারেল সিনেটর জোনাথন ডানিয়াম এবং জোট সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র মিকায়েলিয়া ক্যাশ এই দুই বক্তাকে ভিসা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন।

মিকায়েলিয়া ক্যাশ বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া একটি পশ্চিমা দেশ এবং আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ রয়েছে। যারা এখানে ঘৃণা ছড়াতে আসে, তাদের শুরুতেই প্রবেশাধিকার দেওয়া উচিত ছিল না।’ তিনি বর্তমান সরকারের স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

এর আগে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিস ইন বাংলাদেশ দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে আজহারীর বিষয়ে জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছিল। তারা সতর্ক করেছিল যে, আজহারীর বক্তব্য ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

তবে সফরের আয়োজক সংস্থা ‘ইসলামিক প্র্যাকটিস অ্যান্ড দাওয়াহ সার্কেল’-এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) বিকেলে ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান, ‘প্রবাসী বাংলাদেশিদের আমন্ত্রণে গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ায় একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এরপর একটি জরুরি কাজে দেশে ফিরে এসে তাতে মনযোগ দিয়েছি। আজ সকালে জানতে পারলাম, আমার ভিসা বাতিল করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত বছরও সিডনিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম।’

তিনি আরও বলেন, ভিসা বাতিল সংক্রান্ত লেটারটি ফরমাল এবং সেখানে উল্লেখ ছিল—অস্ট্রেলিয়ায় আসার উদ্দেশ্য ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

‘বিভিন্ন মিডিয়ায় বিষয়টি যেভাবে প্রচারিত হয়েছে, সেরকম কিছু আমি লেটারে দেখতে পাইনি। তবে কয়েকজন বিরোধী রাজনীতিক সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। সম্প্রতি কিছু ইসলামবিদ্বেষী আমাদের বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ এবং বিকৃত অনুবাদ প্রচার করেছে, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে,’ তিনি উল্লেখ করেন।

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ‘যে কোনো অভিযোগ গ্রহণের আগে সঠিক তথ্য যাচাই-বাছাই এবং ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হওয়া উচিত। আমাদের ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ নেই—না কোনো ধর্মের, না কোনো জাতির, না কোনো গোষ্ঠীর প্রতি। বরং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি যে কোনো বিচ্ছিন্ন অন্যায় আচরণেরও আমরা বিরোধিতা করি।’

তাঁর দাবি, তবে ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের যেকোন প্রান্তের মানুষের প্রতি কৃত জুলুমের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান সব সময় ছিল এবং থাকবে। এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এর কারণে কেউ আমাদের প্রতি রুষ্ট হলেও আমরা আমাদের অবস্থান থেকে একচুলও নড়বো না ইনশাআল্লাহ।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222