ধর্মী ডেস্ক: পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামারিদের মধ্যে কোরবানির পশুর নানা রকম নাম রাখার একটি প্রবণতা দেখা যায়। অনেক সময় দেখা যায়, খামারিরা অত্যন্ত সুপরিচিত ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নেতা, ক্রীড়াবিদ কিংবা তারকাদের নামে পশুর নামকরণ করে থাকেন। কেউ কেউ নিছক কৌতূহল বা আদরের ছলে পশুর এমন নাম রাখলেও, অনেকেই আবার কটাক্ষ, হাস্যরস কিংবা কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে ব্যঙ্গ করার উদ্দেশ্যে এই কাজটি করেন। এবারের কোরবানির হাটেও বিশ্ব রাজনীতির আলোচিত ব্যক্তি বা তারকাদের নামে পশুর নামকরণের বেশ কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। এই বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও শরিয়তের নির্দেশনা স্পষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামি শরিয়ত ও ফিকহ বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরবানি হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাকওয়া অর্জনের একটি মহান ইবাদত। পবিত্র কুরআনের সূরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, কোরবানির পশুর গোশত বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় মানুষের তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। অতএব, এই ইবাদতের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ শালীনতা, গাম্ভীর্য এবং শরিয়তের আদব রক্ষা করা আবশ্যক। কোনো অপছন্দের ব্যক্তি কিংবা আলোচিত ব্যক্তিত্বকে ব্যঙ্গ করার উদ্দেশ্যে পশুর এমন নাম রাখা সামাজিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী এবং ইসলামের মৌলিক সৌন্দর্যের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬২৭)
মানুষ যেমন পোষা প্রাণীর পরিচয়ের জন্য নাম ব্যবহার করেন, তেমনি কোরবানির পশুকেও কোনো নামে ডাকা যেতে পারে। তবে কোনো মানুষের নামে নাম রাখা বা ডাকা যাবে না। মানুষের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিকে বিদ্রুপ, অপমান বা হেয় করা ইসলামসম্মত নয়।রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বেশ কিছু বাহন ও পশু ছিল। সেগুলোরও নাম ছিল। তবে কোনোটির নামই মানুষের নামে ছিল না। তাঁর ঘোড়া ছিল সাতটি। প্রত্যেকটির আলাদা নাম ছিল। যথা: এক. সাকবু—এর রং ছিল কালো ও কপালচিতা। দুই. মুরতাযিজ, তিন. লুহাইফ, চার. লেজাজ, পাঁচ. জারিব, ছয়. সাবহাহ, সাত. ওয়ার্দ। তাঁর খচ্চর ছিল তিনটি। এক. দুলদুল—যা ছিল সাদা-কালো ডোরাকাটা; যা মিসরের রাজা মুকাউকিস তাঁর জন্য হাদিয়া পাঠিয়ে ছিলেন। দুই. ফাজ্জাহ—যা ছিল সাদা। যা রোম সম্রাটের পক্ষে মাআনের গভর্নর ফারওয়া আল জুযামি ইসলাম গ্রহণের পর হাদিয়া পাঠিয়ে ছিলেন। তিন. আরেকটি ডোরাকাটা খচ্চর। তাঁর গাধা ছিল দুটি। এক. ইয়াফুর বা উফায়ের—যা ছিল সাদা-কালো ডোরাকাটা। দুই. আরেকটি গাধা ফারওয়া আল জুযামি হাদিয়া পাঠিয়ে ছিলেন।
এই বিষয়ে বারিধারা জামে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারের খতিব এবং জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা মাসউদ আহমাদ জানান, মানুষের নামে পশুর নাম রাখা মূলত মানুষের নামের অবমাননা এবং নামের বিকৃতি ঘটানোর শামিল, যা ইসলামে একেবারেই সমর্থন করে না। পশুকে চেনার সুবিধার্থে বা নির্দিষ্ট করার জন্য সেটির গায়ের রং বা সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ‘লাল’, ‘কালো’ বা ‘সাদা’ ইত্যাদি নামে ডাকা যেতে পারে। অন্যদিকে, রাজধানীর মগবাজার রেলগেইট দিলু ব্যাপারী ওয়াক্ফ এস্টেট জামে মসজিদের খতিব মাওলানা সাদিকুর রহমান আজহারী বলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বা আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে অনন্য মর্যাদা দিয়েছেন। মানুষের এই মর্যাদাপূর্ণ নাম পশুর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অনুচিত এবং নাম বিকৃত করার মতো কাজ ইসলামে গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, কোরবানির মতো পবিত্র ইবাদতের আবহ বজায় রাখতে এই ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সবার বিরত থাকা উচিত।
টিএইচএ/
