গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে অস্ত্র দিয়েছে ৫১ দেশ, দ্বিতীয় শীর্ষ ভারত

by Abid vs36

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের বর্বরতার বিরুদ্ধে যখন বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠছিল, তখনও আড়ালে-আবডালে ইসরায়েলের হাতে মারণাস্ত্র তুলে দিচ্ছিল বিশ্বের বহু দেশ। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার মাসব্যাপী এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানে এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। বৈশ্বিক এই তালিকায় অস্ত্র সরবরাহের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকে তীব্র শীতের দিনে যখন নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বাইরে বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েলের গণহত্যার নিন্দা জানাচ্ছিলেন, তখনও অস্ত্রের এই গোপন সরবরাহ থামেনি। দক্ষিণ আফ্রিকার করা এই মামলায় দেশটির পক্ষে আইরিশ আইনজীবী ব্লিন নি ঘরালাইঘ আদালতকে জানিয়েছিলেন, গাজায় তখন প্রতিদিন গড়ে ১১৭টির বেশি শিশু এবং ৪৮ জন মা নিহত হচ্ছিলেন। এই সতর্কবার্তার পর ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি আইসিজে মামলার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে। রায়ে গাজায় গণহত্যার বাস্তব ঝুঁকি উল্লেখ করে তা ঠেকাতে বিশ্বকে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এই রায় ঘোষণার পরও ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগ পর্যন্ত পরবর্তী ২২ মাসে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং আহত হন ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ। এই পুরো সময় জুড়ে ইসরায়েলে অস্ত্রের জোগান সম্পূর্ণ অব্যাহত ছিল।

বিজ্ঞাপন
banner

আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ সরকারের প্রায় ৫১টি দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে গেছে, যারা প্রত্যেকেই জাতিসংঘের গণহত্যা প্রতিরোধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সদস্য। কিছু ক্ষেত্রে সামরিক সরঞ্জামগুলো এমন সব দেশ থেকে এসেছে, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল বা দেশটিতে অস্ত্র সরবরাহ আংশিকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) তথ্য অনুযায়ী, আইসিজের রায়ের পর ইসরায়েলে অস্ত্র আমদানি কমার বদলে আরও বৃদ্ধি পায়, যার বেশিরভাগই ছিল গোলাবারুদ (মুনিশন) ক্যাটাগরির অধীনে। ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো শীর্ষ পাঁচটি দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র। দেশগুলো যুদ্ধের সময় তাদের অস্ত্রের চালান আরও বাড়িয়ে দেয়।

আইটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ২ হাজার ৬০৩টি সামরিক সরঞ্জামের চালান ইসরায়েলে প্রবেশ করে। এর মধ্যে ছিল গোলাবারুদ, বিস্ফোরক অস্ত্র, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং সাঁজোয়া যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম, যার মোট মূল্য প্রায় ৩.২২ বিলিয়ন শেকেল (৮৮ কোটি ৫৬ লাখ ডলার)। এই আমদানির প্রায় ৯১ শতাংশই এসেছে আইসিজে’র রায়ের পর। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে যুদ্ধের সময় ইসরায়েলে সবচেয়ে বেশি ৪২ শতাংশ অস্ত্র সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ২৬ শতাংশ সরবরাহ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত। অর্থাৎ, অস্ত্র আমদানির মোট মূল্যের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ছিল এই দুটি দেশের দখলে। পরবর্তী তিনটি শীর্ষ সরবরাহকারী দেশ হলো রোমানিয়া (৮ শতাংশ), তাইওয়ান (৪ শতাংশ) এবং চেকপ্রজাতন্ত্র (৩ শতাংশ)। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯ শতাংশ এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো (চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুর) প্রায় ৮ শতাংশ অস্ত্র সরবরাহ করেছে।

যুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বজুড়ে জনগণের চাপের মুখে অনেক দেশের সরকার ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ বা সীমিত করার ঘোষণা দিলেও গোপনে এই সরবরাহ সচল ছিল। সাসেক্স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং বৈশ্বিক অস্ত্র ব্যবসার বিশেষজ্ঞ অ্যানা স্ট্যাভরিয়ানাকিস বলেন, সরকারকে তাদের রপ্তানি নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে জনগণের চাপ এবং কৌশলগত মামলা বড় ভূমিকা পালন করেছে। যেমন স্পেনে ডক শ্রমিকরা ইসরায়েলগামী সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী জাহাজ খালাস করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং কানাডায় বিক্ষোভের মুখে নতুন পারমিট স্থগিত করা হয়।

তবে আল জাজিরা ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি আমদানির ৬৫ লাখেরও বেশি স্বতন্ত্র কাস্টমস এন্ট্রি (এইচএস কোড) বিশ্লেষণ করে দেখেছে, অনেক দেশ প্রকাশ্যে নিষেধাজ্ঞা দিলেও ভিন্ন কোড ব্যবহার করে সরবরাহ বজায় রেখেছে। যেমন, চীন আদালতের নির্দেশ কার্যকরের পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বললেও যুদ্ধ চলাকালীন চীন থেকে ইসরায়েলে ৭১.১ মিলিয়ন শেকেলের সামরিক সরঞ্জাম গেছে, যার ৮৩ শতাংশই পাঠানো হয়েছে আদালতের রায়ের পর। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাস্টমস বুক ও ৯১টি ভারতীয় কাস্টমস রপ্তানি নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভারতীয় সংস্থাগুলো রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস, আইএমআই সিস্টেমস লিমিটেড এবং এমসিটি মেটেরিয়ালস সহ ইসরায়েলি শীর্ষ অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের কাছে নিয়মিত বোমার উপাদান ও মারণাস্ত্র রপ্তানি করেছে।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণহত্যার ঝুঁকি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আদালতের স্পষ্ট সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও কোনো দেশ যদি অস্ত্র বা সামরিক উপাদান সরবরাহ অব্যাহত রাখে, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণহত্যা প্রতিরোধ সনদের অধীনে রাষ্ট্রগুলোর শুধু গণহত্যার শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব নয়, তা প্রতিরোধের দায়িত্বও রয়েছে। ফলে এই অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলো ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইনি দায়ের মুখোমুখি হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, পণ্যের ধরন এবং চূড়ান্ত ব্যবহারের প্রমাণের ওপর নির্ভর করবে।

টিএইচএ /

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222