বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে দান হিসেবে আসা অর্থ ব্যাংকে রাখা এবং সামগ্রিক আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সিলেটের জেলা প্রশাসন থেকে মাজারে আসা টাকাসহ বিভিন্ন ধরনের দানের সুনির্দিষ্ট হিসাব না রাখা এবং আয়-ব্যয়ের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না থাকার অভিযোগ তোলার পর এই পরিস্থিতি নতুন রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম মাজার পরিদর্শন করে অভিযোগ করেছিলেন যে, কিছু ব্যক্তি মাজারের আয় নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে খরচ করেন। যদিও মাজার ব্যবস্থাপনায় জড়িত খাদেম পরিবারগুলো প্রশাসনের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দানের জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি ডেগ বা বড় পাতিল সিলগালা করা হয় এবং মাজার প্রাঙ্গণে একটি নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াকফ এস্টেট ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর পরই জেলা প্রশাসককে বদলি করার বিষয়টি সিলেটে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে, যদিও এই বদলির সাথে মাজারের ঘটনার আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কি-না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন জানান, সম্প্রতি একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এবং এখন থেকে মাজারের দান বাক্সে আসা সমস্ত টাকা সরাসরি ব্যাংকে জমা রাখা হবে।
এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পক্ষে ও বিপক্ষে সিলেটে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়েছে। একপক্ষ মনে করছে, মাজারে আসা বিপুল পরিমাণ দান এতদিন সুনির্দিষ্ট তদারকি ছাড়াই কিছু ব্যক্তি নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে আসছিল, তাই সরকারি তদারকি অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে মাজারের খাদেমরা দাবি করছেন, এটি কোনো রাষ্ট্রীয় বা সরকারি সম্পদ নয়, বরং এটি খাদেমদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ। শাহজালাল মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না জানান, দরগা কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নয় এবং গত ৭০০ বছর ধরে হযরত শাহজালালের সাথে আসা সঙ্গীদের পরিবারের উত্তরাধিকার হিসেবে তারা বংশ পরম্পরায় এই মাজারের খাদেমের দায়িত্ব পালন করছেন। মাজারে আসা অর্থ মেহমানদের সেবা, লঙ্গরখানা পরিচালনা, ৩০ থেকে ৪০ জন চৌকিদারের বেতন, ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী, বার্ষিক ওরশ এবং ৪ তলা মসজিদসহ মাজারের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজেই ব্যয় হয়ে থাকে, যেখানে সরকারের কোনো অনুদান থাকে না। দরগার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে ৩০০টি খাদেম পরিবার রয়েছে এবং ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি অনুযায়ী একেকটি পরিবার বছরে মাত্র এক দিন মাজার পরিচালনার দায়িত্ব ও দিনের আয়ের একটি অংশ পেয়ে থাকে, যা তাদের আইনি অধিকার।
ইতিহাস ও আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দান বাক্সের অর্থ যেভাবে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে গণনা ও ব্যবহার হয়, দেশের অধিকাংশ মাজারের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটে না। স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয় হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন সাধারণত মাজারের আয়-ব্যয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। তবে বাংলাদেশ সরকারের ওয়াকফ প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, শাহজালাল মাজারটি একটি তালিকাভুক্ত ওয়াকফ সম্পত্তি। ১৯১৩ সালের আইন অনুযায়ী দেশের সব মাজার, ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদ বাই-ডিফল্ট ওয়াকফ এবং এগুলোর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। শাহজালাল মাজারটি মূলত ওয়াকফ ফি লিল্লাহ, ওয়াকফ আলাল আওলাদ এবং ব্যবহারিক ওয়াকফ—এই তিন ক্যাটাগরিতেই ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়।
এদিকে গত সোমবার (২২ জুন) জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শাহজালালের মাজারে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দানের ডেগ ও দানবাক্স খুলে প্রকাশ্যে অর্থ গণনার আয়োজন করা হয়। চার দিনের সংগৃহীত দান গণনা করে মোট সাড়ে সতের লাখ টাকা, কিছু বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার পাওয়া গেছে। এর আগে ১৮ জুন বড় তিনটি ডেগ সিলগালা করে দেওয়া হয়েছিল। মাত্র চার দিনে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ার পর মাজারে বার্ষিক মোট কত টাকা আসে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে। সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে প্রায় ২২ হাজার নিবন্ধিত ওয়াকফ এস্টেট রয়েছে, যার অধীনে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৪ একর জমি রয়েছে। তবে বিগত বছরগুলোতে ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ে নিবন্ধিত থাকা সম্পত্তির মধ্যে প্রায় ৮৫ হাজার ৫৭২ একর ভূমি বেহাত হওয়ার তথ্য রয়েছে, যা উদ্ধারে বর্তমানে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শাহজালাল মাজারের এই যৌথ তদারকি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চালুর সিদ্ধান্ত আগামীতে দেশের অন্যান্য বড় মাজারগুলোর অর্থ ব্যবস্থাপনায় কোনো পরিবর্তন আনে কি-না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
টিএইচএ/
