আমরা যারা বাংলাদেশের মানুষ, ছোটবেলা থেকে পাঠ্যবইয়ে ক্ষুদিরাম বসুর বীরত্বগাথা পড়ে বড় হয়েছি। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তাঁর সেই বিখ্যাত গান—”একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি”—শোনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়। ক্ষুদিরাম আমাদের আবেগ, আমাদের জাতীয় বীর।
কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, “মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ” নামটা আমাদের কয়জন জানি?
অথচ এই আব্দুল্লাহও ছিলেন একজন বাঙালি/উপমহাদেশীয় বিপ্লবী, যিনি ব্রিটিশদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ক্ষুদিরামের আন্দোলনের মাত্র কয়েক দশক আগে, ১৮৭১ সালে কলকাতার টাউন হলের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এই আব্দুল্লাহ একাই বুক চিতিয়ে হত্যা করেছিলেন তৎকালীন ফোর্ট উইলিয়াম হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জন প্যাক্সটন নরম্যানকে—যে বিচারক বিপ্লবীদের কঠোর সাজা ও ফাঁসি দেওয়ার জন্য কুখ্যাত ছিলেন।
লক্ষ্য করুন:
ক্ষুদিরাম বসু কিংসফোর্ডকে মারতে গিয়ে বোমা ছুড়েছিলেন, কিন্তু ভুলবশত দুজন নিরীহ ইউরোপীয় নারী মারা যান, কিংসফোর্ড বেঁচে যান। আর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ একাই একটি ছুরি হাতে সরাসরি তাঁর মূল টার্গেট, ব্রিটিশদের প্রধান বিচারপতিকে খতম করেছিলেন।
ফলাফল দুজনেরই ব্রিটিশদের ফাঁসির দড়ি।
তাহলে আজ বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় কেন এই আকাশ-পাতাল বৈষম্য? কেন ক্ষুদিরামের নাম আমাদের মুখে মুখে, আর আব্দুল্লাহর নাম ইতিহাসের পাতা থেকে একপ্রকার মুছে দেওয়া হলো?
এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যতা:
১. আব্দুল্লাহ যুক্ত ছিলেন ওহাবি আন্দোলনের সাথে। আমাদের আধুনিক তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহাসিকরা ওহাবি আন্দোলনকে কেবল “ধর্মীয় আন্দোলন” তকমা দিয়ে আব্দুল্লাহর মতো খাঁটি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের লাইমলাইট থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন।
২. ব্রিটিশরা সুকৌশলে আব্দুল্লাহর সমস্ত তথ্য, ছবি এবং স্মৃতি সেন্সর করেছিল যাতে তিনি মুসলিম তরুণদের আইকন বা শহীদ হতে না পারেন। আর স্বাধীনতার পর আমাদের শিক্ষাবোর্ডগুলোও সেই ব্রিটিশদের তৈরি করা সিলেবাসের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি।
আজ সময় এসেছে এই ঐতিহাসিক বৈষম্যের অবসান ঘটানোর। ইতিহাস কারও একার সম্পত্তি নয়। রক্ত ক্ষুদিরামও দিয়েছেন, রক্ত আব্দুল্লাহও দিয়েছেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য ফাঁসির মঞ্চে যাওয়া প্রতিটা মানুষই সমান শ্রদ্ধার পাত্র।
আসুন, নিজেদের ইতিহাসকে নতুন করে জানি। আব্দুল্লাহদের মতো হারিয়ে যাওয়া বীরদের অবদানের কথা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে জানাই। -মুহা. ইসমাইল খান জিহাদ
