উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যবইয়ে সাহাবীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর ভাষা; সংশোধনের দাবি

by hsnalmahmud@gmail.com

হাসান আল মাহমুদ >>

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) অনুমোদিত উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (প্রথম পত্র) বইয়ে খলিফায়ে রাশেদীন ও অন্যান্য মর্যাদাপূর্ণ সাহাবায়ে কিরাম সম্পর্কে ‘অপমানজনক, অবমাননাকর ও বিকৃত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন
banner

শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও ইসলামি চিন্তাবিদদের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে ধর্মীয় অনুভূতির জন্য মারাত্মক আঘাতজনক আখ্যা দিয়ে পাঠ্যবই দ্রুত সংশোধনের দাবি জানানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ: ভাষা অবমাননাকর ও একপেশে

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. ইব্রাহিম খলিল বলেন, “উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়টি অত্যন্ত জনপ্রিয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে এনসিটিবি অনুমোদিত কয়েকটি বই পর্যালোচনা করেছি এবং গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি—হযরত মুয়াবিয়া (রা.) ও হযরত আমর ইবন আস (রা.) সম্পর্কে যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, তা তাঁদের মর্যাদার পরিপন্থী।”

তিনি আরও বলেন, “যেমন—‘কুচক্রী’, ‘ধূর্ত’, ‘কপট’, ‘ষড়যন্ত্রকারী’, ‘শঠ’, ‘মিথ্যার রটনাকারী’, ‘ক্ষমতালোভী’—এই শব্দগুলো সাহাবায়ে কিরামের মতো জালালতপূর্ণ ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা ধর্মীয় ও নৈতিক দিক থেকে গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীরা এসব পড়ে ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠবে।”

কোন কোন সাহাবা সম্পর্কে আপত্তিকর ভাষা রয়েছে

ড. ইব্রাহিম খলিলের পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিম্নোক্ত সাহাবীদের সম্পর্কে একাধিক পাঠ্যবইয়ে অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে:

  • হযরত মুয়াবিয়া (রা.)
  • হযরত আমর ইবন আস (রা.)
  • হযরত উসমান (রা.)
  • হযরত আয়েশা (রা.)

বিতর্কিত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যে পাঠ্যবইগুলোতে

১. গ্লোব লাইব্রেরি

লেখক: ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান, মো. আবু তাহের পাটওয়ারী, ড. মো. আব্দুল মতিন

শব্দ: “কুচক্রী মুয়াবিয়া”, “ধূর্ততা”, “শঠতা”, “বিশ্বাসঘাতকতা”, “ক্ষমতালোভী”

হযরত আমর ইবন আস (রা.)-কে: “ধূর্ত ও কপট ষড়যন্ত্রকারী”

২. লেকচার পাবলিকেশন্স

হযরত উসমান (রা.) সম্পর্কে: “দুর্বল প্রকৃতির খলিফা”

হযরত মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে: “ক্ষমতালিপ্সু”, “ধৃষ্ট”, “কূটকৌশলী”, “মিথ্যা প্রচারণাকারী”

৩. অক্ষরপত্র প্রকাশনী

উসমান (রা.) সম্পর্কে: “চরিত্রগত দুর্বলতা ছিল হত্যার অন্যতম কারণ”

আয়েশা (রা.) সম্পর্কে: “উষ্ট্রের যুদ্ধের কারণ ছিল তাঁর বিদ্বেষ”

৪. আইডিয়াল বুকস

মুয়াবিয়া (রা.)-কে বলা হয়েছে: “ধূর্ত”, “শের-ই-খোদার ভয়ে পিছু হটেন”

ইসলামি চিন্তাবিদদের প্রতিক্রিয়া

বিশিষ্ট আলেম ও শিক্ষাবিদ মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী  ৩৬ নিউজকে বলেন, “সাহাবায়ে কিরাম হলেন উম্মতের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। তাঁদের নিয়ে এমন ভাষা ইতিহাস বিকৃতি তো বটেই, বরং ঈমান ও আকীদার ওপর আঘাত। এসব শব্দ পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা চরম দায়িত্বহীনতা।”

জাতীয় মুফতী বোর্ড ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুফতি খোরশেদুল আলম কাসেমী ৩৬ নিউজকে বলেন, “এটি সরাসরি সাহাবায়ে কিরামের মানহানি। ইসলামি ইতিহাসকে পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করা এক ধরনের জ্ঞানের ঔপনিবেশিকতা। এটি প্রতিহত করতে হবে।”

অভিভাবকদের উদ্বেগ

ঢাকার একটি কলেজের অভিভাবক মো. আজিজুর রহমান বলেন, “আমার ছেলে বই পড়ে হযরত মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পেয়েছে। এটি খুবই দুঃখজনক ও ভয়ংকর। পাঠ্যবইয়ের এ ধরনের উপস্থাপন একদিকে ঈমানঘাতী, অন্যদিকে ছাত্রদের বিভ্রান্ত করে।”

শিক্ষাবিদদের পরামর্শ: সম্মান বজায় রেখে উপস্থাপন সম্ভব

ড. মুনিরুজ্জামান, পাঠ্যবই বিশ্লেষক ও গবেষক বলেন, “ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে বিকৃতি ছাড়া সম্মানজনক ভাষায় উপস্থাপন করাও সম্ভব। এজন্য ইসলামি স্কলার, ইতিহাসবিদ ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পুনর্মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা উচিত। পাশাপাশি শিক্ষার্থীর বয়স বিবেচনায় পরিমিত ভাষা নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি।”

সংশোধনের জোরালো দাবি

সংশ্লিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা এনসিটিবি’র প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন যে— বিতর্কিত ও অবমাননাকর শব্দ ও ভাষা অবিলম্বে সংশোধন করে একটি পর্যালোচিত, সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ পাঠ্যবই প্রকাশ করা হোক।

তাঁদের মতে, ইসলামের ইতিহাস এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত, যাতে ইতিহাসবোধ, ঈমান ও সম্মানবোধ একত্রে বিকশিত হয়।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222