নিজস্ব প্রতিবেদক
‘আগে যা কিনতাম, এখন তার অর্ধেক কিনি’ চট্টগ্রামের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে এমন আক্ষেপই এখন সাধারণ ক্রেতাদের মুখে মুখে। আয় না বাড়লেও চাল, ডাল, সবজি, মাছ, মাংস, ডিম থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের খরচ বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরছে না।
গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রামের বাজারে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাছ, মাংস, ডিম, মুরগি, সবজি, ভোজ্যতেল, মসলা ও মুদিপণ্য সবকিছুর দামই রয়েছে চড়া। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরীর রেয়াজউদ্দিন ও কাজীর দেউরি বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিত্যপণ্যের বাজারে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। ক্রেতার উপস্থিতি থাকলেও আগের তুলনায় কেনাকাটার পরিমাণ কম। প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে এসে বাজেটের সঙ্গে হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে।
বাজারে গাজর বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪০ টাকা, টমেটো ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, শিম ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ফুলকপি ৬০ টাকা, বাঁধাকপি ৮০ টাকা, ঝিঙে ৮০ থেকে ৯০ টাকা এবং করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, সপ্তাহের ব্যবধানে টমেটোর দাম প্রায় ২০ টাকা এবং শিমের দাম ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যান্য সবজির দামও রয়েছে প্রায় অপরিবর্তিত।
ক্রেতা মো. নাসির বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনা যাচ্ছে না। এক-দুই কেজি করে কিনলেও মোট খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়তদারদের কাছ থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।’
মাছের বাজারেও দেখা গেছে চড়া দাম। রুই ও কাতলা আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৩০ টাকা, পাঙাশ ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, লইট্টা ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, কোরাল ৬৫০ থেকে ১ হাজার টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ইলিশের দাম আকারভেদে ৮০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত।
মাংসের বাজারে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং হাড়ছাড়া গরুর মাংস ৯৫০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা কেজি। খাসির মাংসের দামও ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি।
মুরগির মধ্যে ব্রয়লার ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা, সোনালি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ডিমের দামেও সপ্তাহের ব্যবধানে তেমন পরিবর্তন নেই। ফার্মের লাল ডিম ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা এবং সাদা ডিম ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে।
কাজীর দেউরি বাজারের ক্রেতা জামাল উদ্দিন বলেন, ‘বাজারের অবস্থা এমন হয়েছে যে প্রয়োজন আর সাধ্যের মধ্যে মিল নেই। মাছের দাম বেশি, মাংসের দাম বেশি, সবজির দামও কম নয়। ডিম কিনে কোনোভাবে প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করি, সেখানেও দাম বেশি।’
আরেক ক্রেতা মো. শামীম বলেন, ‘আগে যে পরিমাণ মাছ-মাংস, সবজি ও মুদি পণ্য কিনতাম, এখন তা পারছি না। দাম কমার কথা শুনলেও বাজারে এসে তার কোনো প্রভাব দেখি না। বাজার তদারকির খবরও তেমন শুনি না।’
ক্রেতাদের অভিযোগের বিষয়ে মুরগি বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, ‘আমরা ইচ্ছা করে দাম বাড়াই না। পোল্ট্রি খামারিদের কাছ থেকে যে দামে কিনি, তার সঙ্গে পরিবহন ও দোকানের খরচ যোগ করে বিক্রি করতে হয়। আগের দামে বিক্রি করলে লোকসান হবে।’
মুদি ব্যবসায়ী মো. রুবেল বলেন, ‘ক্রেতারা আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। কিন্তু আমরা যে দামে পণ্য কিনছি, সেই দরের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। আড়তে দাম বেশি থাকলে খুচরা পর্যায়েও দাম কমানো কঠিন।’
বকশিরহাটের পাইকারি বাজারে ভারতীয় চিকন মসুর ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, মোটা মসুর ৯০ থেকে ১১০ টাকা, মুগডাল ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা, চনার ডাল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা এবং মটর ডাল ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া সরু আমন চাল ৭২ থেকে ৭৫ টাকা, মাঝারি চাল ৫৬ থেকে ৬০ টাকা, মোটা চাল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, প্যাকেটজাত আটা ৫৮ থেকে ৬১ টাকা, চিনি ১৩২ থেকে ১৩৫ টাকা, ছোলা ৮৫ থেকে ৯০ টাকা এবং মুগডাল ১২২ থেকে ১২৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
পচনশীল মসলার মধ্যে পেঁয়াজ ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, রসুন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা এবং আদা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারভেদে এসব পণ্যের দরে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
খাতুনগঞ্জের আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমদানি পর্যায়ে পণ্যের দাম, জাহাজীকরণ, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বেড়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দেশের ভেতরে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। এসব ব্যয় যোগ হয়ে পাইকারি বাজারে চাপ তৈরি করছে। তবে কোনো কোনো পণ্যে পাইকারি দর কমতেও শুরু করেছে।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, পরিবহন বা আমদানি ব্যয় বাড়ার বাস্তব প্রভাব থাকলে তার হিসাব বাজারদরেও প্রতিফলিত হতে পারে। তবে সেই অজুহাতে অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো যাবে না।
তিনি বলেন, পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত প্রকৃত ক্রয়মূল্য, পরিবহন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্য যাচাই করা প্রয়োজন। ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়মিত বাজার তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার।
নাজের হোসাইন আরও বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। তাই শুধু বাজারে অভিযান চালালেই হবে না, কোন পর্যায়ে কতটা মূল্য বাড়ছে সেটিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও যদি খুচরা পর্যায়ে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হয়, তাহলে তার কারণ খুঁজে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ভোক্তাদের স্বার্থে বাজারে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম চলছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা রাখা, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কি না এসব বিষয়ও তদারকির আওতায় রয়েছে।
