হাসান আল মাহমুদ >>
তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল ভোটে জয় লাভ করে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়ায় এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়—জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন এবং সেখানে আসন বণ্টনের পদ্ধতি।
বর্তমানে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা ৩০০। জুলাই সনদ অনুযায়ী ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে দুইকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নিম্নকক্ষের পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। তবে এই ১০০ আসন কীভাবে বণ্টিত হবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
জুলাই সনদ অনুযায়ী আসন বণ্টন (ভোটের ভিত্তিতে)
গণভোটের প্রশ্নপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল—রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হবে। সে হিসাবে সম্ভাব্য বণ্টন হতে পারে—
- বিএনপি : ৫৭
- জামায়াত : ৩৬
- এনসিপি : ৩
- ইসলামী আন্দোলন : ২
- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস : ২
মোট : ১০০
বিভিন্ন সূত্রের প্রাপ্ত ভোটের হিসাব অনুযায়ী আরও একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়—
- বিএনপি : ৪৮
- জামায়াতে ইসলামী : ৩৩
- এনসিপি ও শরিকরা : ৯
(মোট ১০০)
বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, আইনগত ভিত্তির দিক থেকে সেটিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ার কথা।
বিএনপির প্রস্তাবিত পদ্ধতি (নিম্নকক্ষের আসন অনুপাতে)
অন্যদিকে, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ ছিল—উচ্চকক্ষ গঠিত হবে সংসদে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে। সে অনুযায়ী সম্ভাব্য বণ্টন দাঁড়ায়—
- বিএনপি : ৭৩
- জামায়াত : ২৪
- এনসিপি : ২
- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস : ১
মোট : ১০০
আরেক হিসাব অনুযায়ী, নিম্নকক্ষে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পাওয়ায় তারা পেতে পারে ৬৯টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ২২টি।
এ নিয়ে বিএনপি আনুষ্ঠানিক অবস্থান না জানালেও দলীয় সূত্র বলছে, তারা ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আগ্রহী। তবে গণভোটের রায় মানা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক কিনা—এ প্রশ্নে নীতিনির্ধারক মহলে আলোচনা চলছে।
উচ্চকক্ষের যোগ্যতা ও ক্ষমতা
জুলাই সনদ অনুযায়ী, নিম্নকক্ষের সদস্যদের মতোই উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ—
- বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে
- ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর
- ঋণখেলাপি না হওয়া
- দুই বছরের বেশি কারাদণ্ডপ্রাপ্ত না হওয়া
সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই উচ্চকক্ষের সদস্য হতে পারবেন। এমনকি এবারের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরাও মনোনয়ন পেতে পারেন।
উচ্চকক্ষের ক্ষমতার মধ্যে থাকবে—
- সংবিধান সংশোধনে অনুমোদন
- রাষ্ট্রপতির অভিসংশনে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন
- সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রশ্ন তোলা
তবে তারা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারবে না এবং সাধারণ বিলে ভোটাধিকার থাকবে না।
কবে গঠন হবে উচ্চকক্ষ?
নতুন এমপিরা শপথ নেওয়ার পর প্রথম ১৮০ কার্যদিবস সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবেন। এই সময়ের মধ্যে জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাব সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠনের বিধান রয়েছে।
সুতরাং শপথের তারিখ থেকে হিসাব করলে অন্তত আট মাসের আগে উচ্চকক্ষ গঠনের সম্ভাবনা নেই।
রাজনৈতিক গুরুত্ব
বিএনপির বিপুল জয় এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ের পর উচ্চকক্ষ এখন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ভোটভিত্তিক না আসনভিত্তিক—কোন পদ্ধতিতে আসন বণ্টন হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে উচ্চকক্ষে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ সংবিধান সংস্কারের গতিপথ।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় সংসদই। ফলে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিকের কার্যক্রমই নির্ধারণ করবে দেশের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার কাঠামো ও রাজনৈতিক সমীকরণ।
হাআমা/
