হাসান আল মাহমুদ >>
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ ঘিরে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির নির্বাচিত সদস্যরা দুই ভূমিকাতেই শপথ নিয়েছেন।
বিএনপির অবস্থান
মঙ্গলবার সকাল ১০টায় শপথ অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা অনুষ্ঠিত হয়। শপথ কক্ষে বক্তব্য দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছেন না।
হাতে শপথের ফরম দেখিয়ে তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি আগে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং কে শপথ পড়াবেন, সে বিধান থাকতে হবে। সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে এ ধরনের কোনো ফরম নেই বলেও তিনি দাবি করেন। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নির্দেশে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন বিএনপির সদস্যদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ বাক্য পাঠ করান।
গণভোট ও জুলাই সনদের প্রেক্ষাপট
রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ৬০ সদস্যের কোরাম হলেই পরিষদ কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও বিএনপির সদস্যরা পরিষদের শপথ না নেওয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপির ৭৭ জন সদস্য সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের সদস্য—দুই পরিচয়েই শপথ নিয়েছেন।
জুলাই নায়কদের প্রতিক্রিয়া
সংবিধান সংস্কার পরিষদে বিএনপির শপথ না নেওয়াকে ‘গণরায়ের প্রতি অবজ্ঞা’ হিসেবে দেখছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম বলেন, “সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া এই সংসদের কোনো মূল্য নেই।” তিনি দাবি করেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, কিন্তু শপথ না নিয়ে সেই রায়কে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, “গণভোটে জনরায়ের সাথে প্রতারণা করে শপথ নিতে যাচ্ছে সরকার।” বিএনপির অবস্থানের প্রতিবাদে এনসিপি দলীয়ভাবে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করে।
এছাড়া জুলাই আন্দোলনের নেতা ও এনসিপির নেতা সারজিস আলম এক টেলিভিশন টকশোতে প্রশ্ন তোলেন—গণঅভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কিংবা গণভোট—কোনোটিই বর্তমান সংবিধানে ছিল না; তাহলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ সংবিধানে খোঁজা হচ্ছে কেন?
এর আগে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বর্তমান সংবিধানকে “আওয়ামী বিধান” বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সংবিধানের সংস্কার প্রয়োজন।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
বিএনপি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরিষদের কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অংশগ্রহণ ছাড়া পরিষদ কার্যকর হবে কি না—তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে এনসিপি ও তাদের মিত্ররা দ্রুত শপথ নিয়ে পরিষদ কার্যকর করার আহ্বান জানাচ্ছে।
হাআমা/
