আতাউল্লাহ নাবহান মামদুহ >>
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুরু থেকেই দুই দেশ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় আলোচনায় অগ্রগতি কঠিন হয়ে পড়ে। বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করায় যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
বুধবার (৮ এপ্রিল) কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারির প্রেক্ষাপটে। সে সময় তিনি ইরানি সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই ইসলামাবাদে আলোচনার সূচনা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি দুই দেশ।
বিবিসির সংবাদদাতা জো ইনউড জানিয়েছেন, নতুন করে হামলা শুরুর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এদিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি, যা ইরান আংশিকভাবে বন্ধ করেছিল, সেটি পুনরায় চালুর বিষয়টি এখন আলোচনার অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

আলোচনার পর ট্রাম্পের নতুন চাপের কৌশল
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল ঘোষণা করেছেন। রোববার (১২ এপ্রিল) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ আরোপের সম্ভাবনার কথা জানান।
ট্রাম্প বলেন, ইরানের আয়ের প্রধান উৎস তেল রপ্তানিকে লক্ষ্য করেই এই পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত ও চীনে ইরানের বিপুল তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। এর আগে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধেও একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইসলামাবাদে টানা ২১ ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও সমঝোতা না হওয়ায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগে রাজি না হওয়ায় আলোচনার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই সামুদ্রিক অবরোধ কার্যকর করে, তাহলে তা শুধু ইরান নয়, পুরো বিশ্বের জন্য ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি করতে পারে। কারণ এমন পরিস্থিতিতে ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে, যা বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার কারণ জানাল ইরান
অন্যদিকে আলোচনা সফল না হওয়ার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রশংসা করে বলেছেন, ইসলামাবাদে হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক উদ্বেগ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, রোববার (১২ এপ্রিল) এক্সে দেওয়া পোস্টে বাকায়ি জানান, দুই পক্ষের মধ্যে অসংখ্য বার্তা ও টেক্সট আদান-প্রদান হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আস্থাভঙ্গ ও ‘অবৈধ দাবি’র কারণে আলোচনায় অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমেরিকার আস্থাভঙ্গ ও দুষ্টতার অভিজ্ঞতা ভুলিনি এবং ভুলব না।’ পাশাপাশি মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, ইরান তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কূটনীতি-সহ সব ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করতে প্রস্তুত।
বাকায়ি আরও বলেন, আলোচনার সাফল্য নির্ভর করে অপর পক্ষের সদিচ্ছা, অবৈধ দাবি থেকে সরে আসা এবং ইরানের বৈধ অধিকার স্বীকার করার ওপর।

সামনে কী যুদ্ধবিরতি থাকবে, নাকি সংঘাত?
সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের এই আলোচনা ছিল একটি বড় কূটনৈতিক উদ্যোগ। তবে তা ব্যর্থ হওয়ায় এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবারও সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাবে?
ট্রাম্পের সামুদ্রিক অবরোধ হুমকি এবং ইরানের পাল্টা অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়—ওয়াশিংটন কি সত্যিই ইরানের জাহাজ আটকানো শুরু করবে, নাকি এটি কেবল চাপ তৈরির কৌশল।
হাআমা/
