‘বিজেপি ভারতবর্ষের স্বাধীনতার বিশ্বাসঘাতক, ব্রিটিশদের দালাল’

আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ

by hsnalmahmud@gmail.com

ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক উসকানি এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণে রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়ের অভিযোগ নতুন নয়। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির বর্তমান নীতিগত অবস্থান ও কার্যক্রম বুঝতে হলে দলটির আদর্শিক উৎস আরএসএস ও হিন্দু মহাসভার ইতিহাস খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এসব সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ ও ‘ব্রিটিশ আনুগত্যের’ গুরুতর অভিযোগ।

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। ভিডিওতে তিনি বলেন, বিজেপির মুসলমান বিদ্বেষের পেছনে ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘বিজেপি ব্রিটিশদের দালাল ছিল। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তাদের নেতা ব্রিটিশ সরকারকে বারবার চিঠি লিখে জীবনভিক্ষা চেয়েছিল, বলেছিল আমি আপনাদের দাস হয়ে থাকব।’

বিজ্ঞাপন
banner

ভাইরাল ভিডিওটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে বিজেপির রাজনৈতিক চরিত্র ও ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়ে।

‘বিরোধীমুক্ত ভারত’ নীতি এবং সংবিধান প্রশ্ন

বামপন্থী নেতা ও সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তুলে বলেছেন, বিজেপির ঘোষিত নীতি হলো ‘বিরোধীমুক্ত ভারত’ প্রতিষ্ঠা করা। তিনি জানান, বিজেপি মুখে বলে কংগ্রেসমুক্ত ভারত, কিন্তু মূল লক্ষ্য হচ্ছে গণতান্ত্রিক বিরোধিতাকে নিশ্চিহ্ন করা।

এবিপি নিউজকে দেওয়া এক বক্তব্যে (৩ জুলাই ২০২২) সুজন চক্রবর্তী বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে কংগ্রেস, আর সংগঠিত আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে বামেরা। কিন্তু আরএসএসের ভূমিকা ছিল বিশ্বাসঘাতকের। তার অভিযোগ, স্বাধীনতার পর সংবিধান রক্ষা করা কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব হলেও বিজেপি সরকার সে দায়িত্ব অস্বীকার করছে এবং দেশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

স্বাধীনতা আন্দোলনে হিন্দু মহাসভা ও আরএসএসের বিতর্কিত ভূমিকা

ভারতের বিভিন্ন গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনেও বারবার উঠে এসেছে বিজেপির পূর্বসূরি হিন্দু মহাসভা এবং আদর্শিক অভিভাবক আরএসএসের ভূমিকার প্রসঙ্গ।

ইন্ডিয়া থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা মুখপাত্র ‘গণদাবী’ ম্যাগাজিন এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, বিজেপি নেতারা ক্ষমতায় এসে নিজেদের জাতীয়তাবাদের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তুলে ধরতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু তাদের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের পূর্বসূরি সংগঠনগুলোর ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

ইতিহাসবিদদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯০৯ সালে গোপালকৃষ্ণ গোখলে পাঞ্জাবে হিন্দু সভা গঠন সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, “এই আন্দোলন খোলাখুলি মুসলমান বিরোধী… এবং উভয়েই জাতীয়তাবাদ বিরোধী।”

১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ বাহিনীর গণহত্যার পর যখন সারা ভারত প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল, তখন ‘পাঞ্জাব হিন্দু সভা’ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের বিরোধিতা করে ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। এমনকি ব্রিটিশ শাসনকে ‘ঈশ্বরের কৃপা’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে দাবি করা হয়।

‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনে’ বিরোধিতা

১৯২৫ সালে নাগপুরে আরএসএস প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত তারা স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আরএসএস তাত্ত্বিক নেতা এম এস গোলওয়ালকারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকারীদের ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

আরএসএস প্রতিষ্ঠাতা কেশবরাও হেডগেওয়ারের জীবনীগ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে যে, ১৯৩০ সালে গান্ধীর আইন অমান্য আন্দোলনে আরএসএস নেতারা সদস্যদের অংশগ্রহণ করতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। বরং আন্দোলনের সময়কে তারা নিজেদের সংগঠন বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখেছিল বলে দাবি করা হয়।

সাভারকর, শ্যামাপ্রসাদ ও ব্রিটিশ আনুগত্যের অভিযোগ

বিজেপির আদর্শিক ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকরকে ঘিরেও রয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়, তিনি ব্রিটিশদের কাছে একাধিকবার ক্ষমা প্রার্থনা করে চিঠি লিখেছিলেন। ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময় তিনি ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগিতার আহ্বান জানান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সমালোচনা করেছিলেন। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদারের গ্রন্থে উদ্ধৃত চিঠিতে দেখা যায়, তিনি ব্রিটিশদের কাছে যুদ্ধকালীন সহযোগিতার কথা তুলে ধরেছিলেন এবং ব্রিটিশ সরকারের নিরাপত্তাকে নিজেদের নিরাপত্তা হিসেবে বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়।

বাজপেয়ীর ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক

বিজেপির সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর ১৯৪২ সালের আন্দোলনে ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কিছু সূত্রে দাবি করা হয়, তিনি পুলিশকে দেওয়া বিবৃতিতে আন্দোলনের নেতা লীলাধর বাজপেয়ীর নাম উল্লেখ করেছিলেন, যার ফলে ওই নেতার কারাদণ্ড হয় এবং গ্রামের ওপর জরিমানা চাপানো হয়।

দেশভাগের ক্ষেত্রেও অভিযোগ

ইতিহাস বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, দেশভাগের জন্য মুসলিম লীগের পাশাপাশি আরএসএস-হিন্দু মহাসভা ও জনসংঘও দায় এড়াতে পারে না। কারণ ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ মুসলিম লীগ তুললেও সাভারকর তার আগেই ‘হিন্দুত্ব’ গ্রন্থে অনুরূপ ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন বলে দাবি রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর একটি বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়, যেখানে তিনি হিন্দু মহাসভাকে ধর্মের নামে রাজনীতি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ করেছিলেন এবং তাদের “বিশ্বাসঘাতক” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

বর্তমান মুসলিম নির্যাতনের প্রেক্ষাপট

বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির বর্তমান মুসলিমবিরোধী রাজনীতি মব লিঞ্চিং, বুলডোজার রাজনীতি, হিজাব বিতর্ক, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), এনআরসি আতঙ্ক এবং ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে বিতর্ক, এসবই তাদের আদর্শিক ধারাবাহিকতার অংশ।

তাদের মতে, বিজেপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়; এটি আরএসএসের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক প্রকল্প বাস্তবায়নের রাষ্ট্রীয় প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে।

বিজেপির জন্ম ১৯৮০ হলেও বিতর্ক থামছে না

তবে তথ্যসূত্র অনুযায়ী, বিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় স্বাধীনতা আন্দোলনে দলটির সরাসরি অংশগ্রহণের প্রশ্ন আসে না। কিন্তু রাজনৈতিক গবেষকদের মতে, বিজেপি যেহেতু জনসংঘ, আরএসএস ও হিন্দু মহাসভার ধারাবাহিক আদর্শিক উত্তরসূরি, তাই স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের পূর্বসূরি সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়েই আজ বিজেপির জাতীয়তাবাদের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিজেপির আদর্শিক পরিবার হিসেবে পরিচিত সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে রয়েছে বহু বিতর্ক ও অভিযোগ। একই সঙ্গে বর্তমান সময়ে বিজেপির শাসনামলে মুসলিম নির্যাতনের নানা ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, যারা অতীতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ ছিল কিংবা বিতর্কিত অবস্থান নিয়েছিল, তারা আজ কীভাবে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের একচ্ছত্র দাবিদার হতে পারে?

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222