দেশের ব্যাংকিং খাত আরও শক্তিশালী, নিরাপদ ও গতিশীল করতে ৪৫ কোটি ডলার অর্থায়নের অনুমোদন দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই এই বড় অঙ্কের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালনা পর্ষদ আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের আওতায় এই অর্থায়নের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আমানতের সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই প্রকল্প ব্যাংক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কারের টেকসই ভিত্তি তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, এই সহায়তার আওতায় আমানত সুরক্ষা তহবিলের মূলধন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো হবে। এর পাশাপাশি আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, একটি কার্যকর জরুরি তারল্য সহায়তা কাঠামো গঠন, সংকটাপন্ন ব্যাংক পুনর্গঠনের কৌশল প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারেও কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বিধিবহির্ভূত ঋণ প্রদানের কারণে বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যাংক খাত নানা ধরনের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। চলতি বছরের মার্চের শেষে দেশে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসমে এই অর্থায়ন প্রসঙ্গে বলেন, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক খাত প্রয়োজন। কিন্তু মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ ধারণকারী ব্যাংক খাত বর্তমানে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্প ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা প্রদান, ব্যাংক খাতে গ্রাহকদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাংক খাতকে সহায়তা করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, আধুনিক ব্যবস্থা ও টেকসই সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে সরাসরি সাহায্য করবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামো সম্পূর্ণ আধুনিকায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে দিন দিন বাড়তে থাকা সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করা এবং আর্থিক খাতজুড়ে তথ্য ও বিশ্লেষণসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতিগুলো পূরণ করা সম্ভব হবে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, তথ্যনির্ভর ও ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ ও প্রকল্পটির টাস্ক টিম লিডার তোশিয়াকি ওনো বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই প্রকল্প ব্যাংক খাতের যেকোনো সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীতিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখবে।
টিএইচএ/
