মানুষের জীবনে যে নিয়ামতগুলো গভীরভাবে প্রোথিত, মাতৃভাষা তার অন্যতম। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ তার চিন্তা প্রকাশ করে, জ্ঞান অর্জন করে, অনুভূতি বিনিময় করে এবং সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণ করে। ইসলামের দৃষ্টিতে মাতৃভাষা কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের একটি স্পষ্ট নিদর্শন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং মানুষের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য তাঁর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, ভাষার ভিন্নতা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য বিশেষ দান, যা মানুষের পরিচয়, সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্য বহন করে।
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক জাতির কাছে তাদের নিজস্ব ভাষাভাষী রাসুল প্রেরণ করেছেন, যাতে মানুষ সহজে দ্বীনের বার্তা বুঝতে পারে। এটি প্রমাণ করে, মাতৃভাষা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। ভাষার প্রতি এই গুরুত্ব ইসলামের সার্বজনীন ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।
Muhammad (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজ কওমের ভাষায় কথা বলতেন এবং মানুষের বোধগম্য, সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় দাওয়াত দিতেন। তাঁর ভাষা ছিল প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী, যাতে শ্রোতারা সহজেই তা অনুধাবন করতে পারে। এর মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে—সত্য ও ন্যায়ের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে ভাষা হতে হবে সহজ, আন্তরিক ও হৃদয়ের কাছাকাছি।
মাতৃভাষা মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রধান বাহক। শিশুর প্রথম উচ্চারণ, মায়ের স্নেহভরা ডাক, ইবাদত ও প্রার্থনার স্বতঃস্ফূর্ত ভাষা—সবই মাতৃভাষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই মাতৃভাষাকে অবহেলা করা মানে নিজের শিকড়কে অবহেলা করা। ইসলাম কখনো শিকড়চ্যুতি সমর্থন করে না; বরং নিজস্ব পরিচয় রক্ষা করেই আল্লাহর পথে চলার শিক্ষা দেয়।
একই সঙ্গে ইসলাম অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিও সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানায়। যদিও কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে আরবি ভাষায়, ইসলামের বার্তা কোনো নির্দিষ্ট জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর সব ভাষাভাষী মানুষই এই আহ্বানের অন্তর্ভুক্ত। তাই মাতৃভাষাকে ভালোবাসা ও লালন করার পাশাপাশি অন্যান্য ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিও সম্মান দেখানো ঈমানি দায়িত্বের অংশ।
এনআর/
