বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। দেশের বিভিন্ন জেলায় ‘ইলেক্ট্রনিক জামিননামা’ বা ই-বেইলবন্ড চালুর মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়াকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও ঝামেলামুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সোমবার (২০ এপ্রিল) বগুড়ায় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এই সিস্টেমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই অনুষ্ঠানে আইনজীবী সমিতির নতুন ভবনও উদ্বোধন করা হয়।
সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো আদালত থেকে কারাগার পর্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়াকে সংক্ষিপ্ত করা। আগে একটি জামিননামা কার্যকর হতে প্রায় ১৩টি ধাপ অতিক্রম করতে হতো, যা সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়াত। নতুন ই-বেইলবন্ড ব্যবস্থায় সেই প্রক্রিয়া এখন অনলাইনে দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনের শাসন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর চেয়েও বেশি জরুরি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তার মতে, ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া আইনের শাসন পূর্ণতা পায় না।’
প্রাথমিকভাবে বগুড়াসহ ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়া- এই সাত জেলায় ই-বেইলবন্ড চালু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব আদালতে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ব্যবস্থায় বিচারক অনলাইনে জামিন আদেশ যাচাই করে সরাসরি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে পারবেন। ফলে জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তির মুক্তি পেতে আর দীর্ঘ অপেক্ষা বা দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না।
সরকারের মতে, ডিজিটাল এই প্রক্রিয়া চালু হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং জামিননামা জালিয়াতির সুযোগও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমবে উল্লেখযোগ্যভাবে।
এছাড়া ভবিষ্যতে এই সিস্টেমকে পুলিশ বিভাগের ডাটাবেইস, আদালতের কেস ম্যানেজমেন্ট এবং জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, শুধু জামিন নয়- প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট, রিলিজ অর্ডার এবং ওয়ারেন্ট রিকলসহ বিভিন্ন বিচারিক কার্যক্রমও ধীরে ধীরে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। এতে এক জেলার আসামি অন্য জেলায় গ্রেফতার হলে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হবে এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমবে।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেন, ন্যায়বিচার কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিও সমান আইনের আওতায় থাকবে।
তিনি আরও বলেন, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না হলে গণতন্ত্রের সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়। তাই আইন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
সরকার মনে করছে, আদালতকে যদি মানুষের কাছে নিরাপদ ও ন্যায়ের জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে সমাজে সহিংসতা ও অবিশ্বাস কমবে। সেই লক্ষ্যেই প্রযুক্তিনির্ভর বিচারব্যবস্থার এই উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হাআমা/
