যে দেখতে আপনার মতো, যে চিন্তা করে আপনার মতো, তার উপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সহজ এবং স্বাভাবিক।
কিন্তু যে আপনার মতো নয়, আপনার কৌমের নয়, এমন কি যে হয়তো বিভিন্ন সময়ে আপনার বিপক্ষেই দাঁড়ায়, তার উপর হওয়া জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারাটাই আপনার নৈতিক উচ্চতার প্রমাণ।
দুঃখজনক হলেও সত্য শাপলা হত্যাকান্ডের সময় সেই নৈতিক অবস্থানটা আমাদের সমাজের ‘আলোকিত’ অংশ দেখাতে পারে নাই। একটা সমাবেশে বাতি নিভায়ে ৫৭জন মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলা হইলো, কোথাও একটা টু শব্দ হইলো না। টু শব্দতো অনেক পরের কথা বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যম থেকে আমি বহু দিন জানতেই পারি নাই আসলে কয়জন মানুষ মারা গেছে ঐ রাতে।
এই হত্যাযজ্ঞ যেমন অপরাধ, একই মাত্রার না হলেও আমরা যারা এই হত্যাকাণ্ডকে গুম করে ফেলেছিলাম তাদের অপরাধও কম কি?
যারা ঐদিন মারা গেছে তারা এতোই হতভাগা যে তাদের কেউই আমাদের কালেকটিভ শোকের অংশ হইয়া উঠতে পারে নাই। তাদের নিয়া কেউ লেখে নাই কোনো গল্প, বানায় নাই কোনো সিনেমা।
আমাদের সমাজের আদারাইজেশন ভয়াবহ এক ঘটনা। আমার বন্ধুদের অনেকেই এনলাইটেনড মানুষের কথা বলে। আমি অনেক ভেবে বোঝার চেষ্টা করেছি এটার মানে কী? কারন গুম-খুনের পক্ষে যারা সম্মতি উৎপাদন করছিলো, যারা খালেদা জিয়াকে জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করে করে তার উপর হওয়া জেল-জুলুমের রাস্তা তৈরি করছিলো, যারা জুলাইয়ে ছাত্র-গণহত্যার সময়ে খুনীর পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করার চেষ্টা করছিলো তাদের অনেকেই তো ‘আলোকিত’ মানুষ, ‘আলোকিত’ পুস্তক পড়েন, ‘আলোকিত’ সিনেমা দেখেন, ‘আলোকিত’ সংগীত শোনেন।
আমাদের ‘আলোকপ্রাপ্তি’র ব্যাপারটাতে তাহলে কোনো ঝামেলা আছে? যদিও আমি ঐ রাতে শাপলায় গুলির নিন্দা করছিলাম, তবুও এই আত্মসমালোচনাটা এখানে টুকে রাখলাম।
জুলাই যাদুঘর নিয়ে কাজ করতে যেয়ে শাপলার অনেক শহীদের গল্প কাছ থেকে জানছি। বহুবার শাপলার ডিসপ্লে রুমে গিয়ে চোখের পানি আটকাতে পারি নাই। যে মানুষগুলা এর আগে আমার কাছে ছিলো টপ শটে দেখা টুপির সমাহার, তারা আমার কাছে ইনডিভিজুয়াল হয়ে উঠলো। তাদের একটা চেহারা তৈরি হইলো। তাদের চোখের কোণায় কান্না দেখলাম।
সংযুক্তিঃ হেফাজতের দাবিদাওয়ার সাথে দ্বিমত পোষণ করেও আপনি তাদের উপর হওয়া রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞে ব্যথিত হতে পারেন, প্রতিবাদ করতে পারেন।
এই বিষয়ে যারা দ্বিধান্বিত তাদের প্রতি এই ছোট্ট সংযুক্তি।
লেখক: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও চলচ্ছিত্র প্রযোজক
হাআমা/
