৩৬ নিউজ ডেস্ক :: ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়ে আমাদের কাছে আবার ফিরে এলো পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলমানদের জীবনে বছরে দুটি প্রধান আনন্দ-উৎসবের একটি ঈদুল আজহা। বকরি ঈদ।
হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হয়। ঈদুল ফিতরের মতো এ ঈদে আগের দিন চাঁদ দেখা নিয়ে আগ্রহ থাকে না; ১০ দিন আগেই ঈদের তারিখ নির্ধারিত হয়ে যায়। সে অনুযায়ী পশু কেনা থেকে শুরু করে গ্রামের বাড়িতে ফেরা—সব ধরনের প্রস্তুতি আগেভাগেই সেরে নেন মানুষ।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের বলেছেন,
‘ঈদজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ এলো আবার দুস্রা ঈদ
কোরবানি দে কোরবানি দে শোন্ খোদার ফর্মান তাকিদ।।’
আজ ২৮ মে, ১০ জিলহজ বৃহস্পতিবার দেশে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে উদ্যাপিত হচ্ছে কোরবানির ঈদ। আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর মেলবন্ধনে আবারও মুখর হয়ে উঠেছে বাঙালির চিরায়ত পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের বন্ধন। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ও পথের কষ্টকে তুচ্ছজ্ঞান করে মানুষ পৌঁছে গেছে প্রিয়জনের কাছে। এই ত্যাগের মধ্য দিয়েই পাওয়া মিলনের আনন্দ ঈদ উৎসবের রংকে আরও গভীর করেছে।
ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। এই দিনে কি ধনী কি নির্ধন—সবাই যার যার সাধ্যমতো নতুন, নয়তো পরিষ্কার কাপড় পরে, গায়ে আতর-সুগন্ধি মেখে মসজিদ কিংবা ঈদগাহে এক কাতারে দাঁড়াবেন। নামাজ শেষে বুকে বুক মিলিয়ে ছড়িয়ে দেবেন ভ্রাতৃত্বের বার্তা।
এরপর মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের আশায় সামর্থ্য অনুযায়ী দেওয়া হবে পছন্দের পশু কোরবানি। প্রত্যেক আর্থিক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি দিল না, সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে।’
আমাদের দেশে সাধারণত গরু, ছাগল বা মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে দুম্বা, ভেড়া ও উট কোরবানি দেওয়া হয়ে থাকে। আমাদের এ অঞ্চলে শত বছর বা তারও আগে সাধারণত বকরি বা ছাগল কোরবানি দেওয়া হতো। এ জন্য এই ঈদের পরিচিতি ছিল ‘বকরি ঈদ’ বা ‘বকরিদ’। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এ অঞ্চলে গরু কোরবানি দেওয়া বাড়তে থাকে।
কোরবানি হয়ে গেলে মাংস তিন ভাগ করে যিনি কোরবানি করবেন, তিনি নেবেন এক ভাগ, বাকি দুই ভাগ আত্মীয়স্বজন ও গরিব-দুঃখীর মধ্যে বিলিয়ে দেবেন। এভাবে বণ্টন করতে ইসলাম উৎসাহিত করেছে। সমাজে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্যই ধর্মের এই আহ্বান।
আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য ও সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এই ঈদুল আজহা। এ উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে ত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত। হজরত ইব্রাহিম (আ.) মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। পরম করুণাময় আল্লাহর অপার মহিমায় ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়।
ঈদের প্রধান জামাত
রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে হবে ৫টি ঈদের জামায়াত। আবহাওয়া বিরূপ থাকলে এবং এ কারণে জাতীয় ঈদগাহে জামাতের আয়োজন সম্ভব না হলে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সকাল ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে।
বায়তুল মোকাররমে পবিত্র ঈদুল আজহার পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জামাত সকাল ৭টায়। এরপর সকাল ৮টা, ৯টা, ১০টা এবং বেলা পৌনে ১১টায় বাকি জামাতগুলো হবে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে।
ঢাকার বাইরে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দান ও দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ ময়দানে দেশের বড় জামাতগুলো হয়ে থাকে। দূরদূরান্ত থেকে, ভিন্ন জেলা থেকেও মুসল্লিরা শরিক হন এসব ঈদের জামাতের মহামিলনে।
বৃষ্টি হতে পারে চার বিভাগে
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আজ ঈদুল আজহার দিন দেশের অন্তত চার বিভাগ রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহীর বেশির ভাগ স্থানে বৃষ্টি হতে পারে। হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগেও। অপেক্ষাকৃত শুষ্ক থাকতে পারে খুলনা ও বরিশাল বিভাগ।
রাজধানী ঢাকায় ঈদের দিন হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ তরিকুল নেওয়াজ কবীর। তবে রাজধানীতে বৃষ্টিটা ঠিক কখন হবে, তা নিশ্চিত নয়। সকালে না হলেও বিকেলে হতে পারে।
শুভেচ্ছা ও ঈদের দিনের আয়োজন
ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘ঈদুল আজহা ত্যাগ, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত বার্তা নিয়ে আবারও মুসলিম বিশ্বের দ্বারে এসেছে। আল্লাহ যেন আমাদের ত্যাগ কবুল করেন এবং মাতৃভূমিসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ও মানবজাতির জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা দান করেন।’
ঈদুল আজহা উপলক্ষে টেলিভিশন ও রেডিওতে সম্প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সংবাদপত্র আয়োজন করেছে বিশেষ সংখ্যার। ঈদের দিন সরকারিভাবে হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও শিশুসদনে উন্নতমানের বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হবে।
ঈদের ছুটিতে পাঠক যেন তথ্য ও বিশ্লেষণ থেকে বঞ্চিত না হন, এ জন্য ছাপা সংবাদপত্র বন্ধ থাকলেও চালু থাকছে অনলাইনগুলো। এই ঈদে ছুটির পাঁচ দিনই বের হচ্ছে প্রথম আলো ই-পেপার।
