আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: লোহা পুড়িয়ে যখন নতুন কিছু তৈরি হয় তখন এটা ধারালো হবেই। আফগানিস্তান সেই সোভিয়েত আমল থেকেই নিজেদেরকে পুড়িয়ে তৈরি করেছে। বিশ্ব বন্ধ করে রেখেছে উন্নয়নের দোয়ার। তবু থেমে নেই তাদের অগ্রযাত্রা। অর্থনীতি, ব্যবসায়, বৈদেশিক পণ্য আমদানি-রপ্তানিতেও যোগ্যতর ভূমিকা রেখে চলেছে। নিজেদের গোয়েন্দাবৃত্তিকেও করেছে মজবুত। হ্যাঁ, আফগানিস্তান এখন আর প্রক্সি যুদ্ধের ময়দান নয়।
গত শুক্রবার (১৯ জুন) রাতে আফগান বিমানবাহিনী পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন বেলুচিস্তান ও পশতুনখোয়ার কয়েকটি স্থাপনায় সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত হামলা চালায়। আফগান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব স্থাপনা ভাড়াটে যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছিল, যাদের আফগানিস্তান ও অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলতে পরিচালিত করা হচ্ছিল।
এই হামলার মাধ্যমে তিনটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রথম বার্তা হলো, আফগানিস্তান আর আগের অবস্থানে নেই। দেশটিতে এখন এমন একটি দায়িত্বশীল ব্যবস্থা রয়েছে, যারা নিজেদের জনগণ ও ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে ফরজ দায়িত্ব পালনের চেয়ে কোনো অংশে কম পবিত্র মনে করে না।
দ্বিতীয় বার্তা হলো, আফগানিস্তান এখন আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী। এই সক্ষমতার মাধ্যমে দেশটি দ্রুতগতিতে এবং উচ্চমাত্রার নির্ভুলতার সঙ্গে নিজের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, আফগান সক্ষমতা প্রতিপক্ষের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। আফগান গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রতিপক্ষের কেন্দ্রগুলোতে অনুপ্রবেশ করে স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এটি বড় ধরনের নিরাপত্তা সাফল্য, যা অপর পক্ষের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করছে এবং তাদের পরিকল্পনা শুরুতেই নস্যাৎ করে দিচ্ছে।
সার্বভৌম যে কোনো রাষ্ট্রের মতো আফগানিস্তানও নিজেদের স্বার্থ রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুসংহত করার পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। দেশটির মতে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আস্তানা ও প্রশিক্ষণ শিবির, পাশাপাশি কাল্পনিক বিভাজনরেখা ‘ডুরান্ড’ বরাবর আফগানিস্তানকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনাগুলোই কঠোর ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার কারণ হয়েছে। গত সপ্তাহের শুরুতে চালানো সুনির্দিষ্ট হামলাগুলো এসব শত্রুতাপূর্ণ গোয়েন্দা পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের মতে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা পর্যায়ে আফগানিস্তানের এই অগ্রগতি শুধু অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা জোরদার এবং বাইরের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির অবস্থান শক্তিশালী করতেও ভূমিকা রাখছে।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সাফল্য প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ব্যর্থ করার পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে অঞ্চলকে আফগানিস্তানের এমন একটি চিত্র দেখিয়েছে, যে রাষ্ট্র সতর্ক ও সজাগ থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা সুসংহত করতে কাজ করছে।
বলা হচ্ছে, তুরস্ক, ইরান, চীন, রাশিয়া, ভারত ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো এখন আফগানিস্তানকে এমন একটি দেশ হিসেবে দেখছে, যা নিজের জাতীয় সীমানার বাইরেও ভূমিকা রাখছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মোকাবিলার মাধ্যমে দেশটি অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষায় অবদান রাখছে। এ প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন বেলুচিস্তানে আহমদ কাজানজি নামে পরিচিত ব্যক্তির গ্রেপ্তারকে এসব তৎপরতার পেছনে থাকা পক্ষগুলোর একটি ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
আফগান সরকার জানিয়েছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কঠোর নজরদারির আওতাধীন এলাকাগুলোর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রমের সম্পর্ক নতুন কোনো ঘটনা নয়। তাদের দাবি, প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের এর আগেও ওই ঘাঁটিগুলোতে দেখা গেছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণে ইমারাতে ইসলামিয়ার সরকার জানিয়েছে, তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে গোয়েন্দা প্রতিবেদন শেয়ার করেছে। এসব প্রতিবেদনে বেলুচিস্তান ও পশতুনখোয়ার কয়েকটি এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রমের তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে সরকার প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, আফগানিস্তান ও অঞ্চলের নিরাপত্তা অস্থিতিশীল করার প্রকল্পে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার যে ভূমিকার কথা তারা বলছে, তা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে।
আফগান সরকারের মতে, গত পাঁচ বছরে প্রতিপক্ষ আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে নানা উপায় ও চাপ প্রয়োগ করেছে। এর মধ্যে ছিল শরণার্থীদের জোরপূর্বক বহিষ্কার, বিভাজনরেখা বরাবর উত্তেজনা সৃষ্টি, বিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতা, পলাতক ও বিরোধী ব্যক্তিদের একত্র করা, ট্রানজিট পথ বন্ধ করে দেওয়া এবং সরাসরি সামরিক সংঘাতের হুমকি দেওয়া। তবে আফগানদের দৃঢ়তা ও ঐক্য তাদের সেই লক্ষ্য অর্জন করতে দেয়নি।
এই ভাষ্য অনুযায়ী, চাপ প্রয়োগের সব পথই উল্টো ফল দিয়েছে। এর ফলে প্রতিপক্ষ নতুন কৌশল গ্রহণে বাধ্য হয়েছে। সেই কৌশল হলো, কয়েক বছর আগে ইমারাতে ইসলামিয়ার মুজাহিদদের কাছে আত্মসমর্পণ করা স্থানীয় বাহিনীর সাবেক সদস্যদের পুনর্গঠন ও পুনরায় সশস্ত্র করা, যাতে তাদের আবার আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়।
এই অবস্থানের শেষে আফগান কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানি সামরিক নেতা ও উপদেষ্টাদের হিসাব-নিকাশ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছে, যারা আমেরিকার উদার সহায়তা ও বিপুল সুযোগ-সুবিধা পেয়েও টিকে থাকতে পারেনি এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়েছে, তারা আজ সামান্য বেতন ও সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কীভাবে এমন এক প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করবে, যাকে তারা বিজয়ী বলে বর্ণনা করে? অথবা তাদের দিয়ে যে স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা কীভাবে তারা অর্জন করবে?
সূত্র: হুরিয়াত রেডিও
