নিজস্ব প্রতিবেদক :: টাঙ্গাইলের কুরতুবী আলিম মাদরাসার পাঁচ ছাত্রী সাধারণ কলাকে উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যে রূপান্তরের অভিনব ধারণা নিয়ে আলোচনায় এসেছেন। আধুনিক জিনপ্রযুক্তির তাত্ত্বিক প্রয়োগের মাধ্যমে তারা এমন একটি গবেষণা মডেল তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে পুষ্টিহীনতা মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘প্রোটিনসমৃদ্ধ কলা তৈরির জন্য কলার ডিএনএ নিষ্কাশন ও রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ মডেল’ শীর্ষক প্রকল্পটি চলতি বছরের বিজ্ঞান মেলাগুলোতে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। টাঙ্গাইল সদর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিজ্ঞান মেলায় প্রথম স্থান অর্জনের পর বিভাগীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হয়ে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় অংশ নেয় দলটি।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা হলেন অনামিকা আলফী আমরি, মিফতাহুল জান্নাত মায়া, ফাতেমাতুজ জহুরা, মেঘলা আক্তারসহ আরও একজন শিক্ষার্থী। জীববিজ্ঞানের ল্যাব ক্লাসে ডিএনএ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সময় তাদের মাথায় এই উদ্ভাবনী ধারণা আসে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কলা শক্তি, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ হলেও এতে মানবদেহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অ্যামাইনো অ্যাসিড ‘লাইসিন’-এর পরিমাণ তুলনামূলক কম। এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই তারা মসুর ডাল থেকে ডিএইচডিপিএস (DHDPS) জিন নির্বাচন করে একটি তাত্ত্বিক জিন-সংযোজন মডেল তৈরি করে।
শিক্ষক আরিফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে প্রথমে সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে কলার ডিএনএ নিষ্কাশন করা হয়। এরপর রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তির ধারণা কাজে লাগিয়ে মসুর ডালের নির্বাচিত জিন কলার ডিএনএতে সংযুক্ত করার একটি বৈজ্ঞানিক রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস, বাস্তবে এ প্রযুক্তি সফলভাবে প্রয়োগ করা গেলে কলা আরও পুষ্টিকর খাদ্যে পরিণত হতে পারে।
দলের সদস্য অনামিকা আলফী আমরি বলেন, বাংলাদেশে এখনো অনেক শিশু ও গর্ভবতী নারী প্রোটিন ঘাটতিজনিত সমস্যায় ভোগেন। আমাদের এই ধারণা বাস্তবায়িত হলে পুষ্টিহীনতা দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মিফতাহুল জান্নাত মায়া বলেন, কলা দেশের প্রায় সব মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা একটি ফল। এর পুষ্টিমান বৃদ্ধি করা গেলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এটি কার্যকর পুষ্টির উৎস হতে পারে।
ফাতেমাতুজ জহুরার মতে, কৃত্রিম সাপ্লিমেন্টের পরিবর্তে জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাকৃতিক খাদ্যের পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করা ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
অন্যদিকে মেঘলা আক্তার বলেন, এ ধরনের কলা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা তৈরি হতে পারে।
প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক আরিফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তা ও গবেষণার আগ্রহই এ সাফল্যের মূল শক্তি। তিনি জানান, প্রকল্পটি মূলত একটি বৈজ্ঞানিক মডেল, যা দেখিয়েছে কীভাবে জিন স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড উৎপাদনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করা যেতে পারে।
কুরতুবী আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. রেজাউল করিম বলেন, দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান ও গবেষণায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার ফলেই এমন সৃজনশীল উদ্যোগ সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে প্রতিষ্ঠানটির সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
