আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চলতি বিধানসভার বাজেট অধিবেশনেই আগামী সোমবার (২৯ জুন) মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সংক্রান্ত বিল পেশ করতে চলেছেন। এর আগে নির্বাচনী প্রচারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জোর দিয়ে বলেছিলেন যে বিজেপি জয়লাভ করলে ‘এক নিশান’, ‘এক বিধান’, ‘এক সংবিধান’-এর পথে চলবে পশ্চিমবঙ্গ। সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মাথায় প্রথম অধিবেশনেই এই বিল নিয়ে আসা নতুন প্রশাসনের প্রবল তৎপরতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাজ্যে এই বিল পাস হলে আসাম, উত্তরাখণ্ড ও গোয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ হবে ভারতের চতুর্থ রাজ্য যেখানে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হবে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় কলকাতার রবীন্দ্র সদনে সিটিজেন এমপাওয়ারমেন্ট ফোরামের উদ্যোগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৮৯তম জন্মজয়ন্তী ও রাষ্ট্রগীত ‘বন্দে মাতরম্’-এর ১৫০তম বর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে ভাষণ দেয়ার সময় লাভ জিহাদ ও বলপূর্বক ধর্মান্তকরণ নিয়ে কড়া বার্তা দিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, আপনারা ভরসা রাখবেন এবং আমাদের একটু সময় দেবেন। ল্যান্ড জিহাদ, লাভ জিহাদ আর বলপূর্বক ধর্মপরিবর্তন করার বিরুদ্ধে অর্থাৎ ধর্মান্তকরণের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর এবং কঠিন আইন এই সরকার নিয়ে আসবে। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ইউনিফর্ম সিভিল কোড বাংলায় কার্যকর হবেই। এর একটি আইনি প্রক্রিয়া আছে এবং আমরা বিধানসভায় সবটা বিস্তারিত জানাব। কর্মরত একজন বিচারপতির নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি তৈরি করা হবে, যারা এর রূপরেখা নির্ধারণ করবেন।
বিধানসভা সূত্রে জানা গেছে, আগামী সোমবার মোট পাঁচটি বিল পেশ করা হতে পারে যার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ২০২৬’ বিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্পিকার রথীন্দ্র বসুর ডাকা কার্যবিবরণী কমিটির বৈঠকে বিলটি পেশ করার কথা জানানো হয়েছে। এই বিল বিধানসভায় পেশ করার পরে আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট সময় দেয়া হবে, যেখানে মুখ্যমন্ত্রীসহ বিজেপি বিধায়ক এবং বিরোধী দলের বিধায়করাও অংশ নেবেন। মূলত এই আইন দেশের সব সম্প্রদায়ের জন্য এক ও অভিন্ন আইনি ব্যবস্থার কথা বলে। এটি চালু হলে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, লিভ-ইন রিলেশন ও দত্তকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে আইন সবার জন্য একই হবে। এই আইনে ছেলে ও মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স একই করা হবে এবং ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের অবসান ঘটিয়ে তিন তালাক, বহুবিবাহ ও হালালা বিয়ে একেবারে নিষিদ্ধ করা হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইনের সবচেয়ে বড় সমাজতাত্ত্বিক দিক হলো লিঙ্গভিত্তিক সমতা প্রতিষ্ঠা করা। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যক্তিগত আইনে নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে নানা অসমতা লক্ষ্য করা যায়, বিশেষত সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার এবং বিবাহবিচ্ছেদের পর খোরপোশ পাওয়ার ক্ষেত্রে। ইউসিসি বলবৎ হলে সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে নারীরা আইনি ক্ষেত্রে সমমর্যাদা ও অধিকারের সুযোগ পাবেন। তবে সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় আইন মেনেই পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাবিত বিলেও পাহাড় ও জঙ্গলমহলের কিছু বিশেষ আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতি-নীতি এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাদের এর আওতামুক্ত রাখা হতে পারে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পাশাপাশি সোমবার বিধানসভায় আরও দুটি অত্যন্ত কড়া বিল পেশ করতে চলেছে রাজ্য সরকার। মূলত সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, দাঙ্গা হাঙ্গামা এবং পুলিশ ও সরকারি কর্মচারীদের ওপর হামলা রুখতে এবং অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান রেখে এই বিলগুলো আনা হচ্ছে।
টিএইচএ/
