বিশেষ প্রতিবেদক:: সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বড়চাতল এলাকার ‘আটগ্রাম-১’ কূপ। দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে এই অঞ্চলের বিপুল জ্বালানি সম্পদের সম্ভাবনা। ১৯৮১ সালের মে মাসের শেষভাগে এই কূপ থেকে বাণিজ্যিকভাবে তেল উত্তোলনের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু উদ্বোধনের ঠিক আগের রাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর থমকে যায় পুরো প্রক্রিয়া। এরপর সাড়ে চার দশকে আর সচল হয়নি কূপটি।
অভিযোগ উঠেছে, দেশের একটি শক্তিশালী জ্বালানি আমদানিকারক সিন্ডিকেটের অশুভ তৎপরতা ও কমিশনের রাজনীতির কারণেই এত বছর ধরে এই খনিটিকে অবহেলা করা হয়েছে। প্রতিবছর বিদেশ থেকে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার (৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার) জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। দেশীয় খনি থেকে তেল উত্তোলন শুরু হলে এই বিশাল আমদানির কমিশন ও একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সিন্ডিকেটটি ‘প্রযুক্তির অভাব’ ও ‘অলাভজনক’ হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে খনির কাজ ফাইলবন্দি করে রাখে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
দীর্ঘদিন পর সম্প্রতি বিষয়টি জাতীয় সংসদে আলোচনায় আসার পর টনক নড়েছে প্রশাসনের। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, কানাইঘাটের ওই অঞ্চলে আধুনিক থ্রিডি (3D) সিসমিক সার্ভে ও পুনরায় ড্রিলিংয়ের জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ভেঙে ফেলা হচ্ছে চার দশকের স্থবিরতা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আটগ্রাম-১ কূপটি যদি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়, তবে দেশের অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
জ্বালানির দাম হ্রাস: অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে তেল মিললে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। ফলে দেশের বাজারে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসতে পারে।
বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ: তেলের দাম কমলে সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। বাস ও ট্রাকের ভাড়া কমলে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ খরচ কমবে, যার সুফল পাবেন সাধারণ ভোক্তা।
কৃষি খাতে স্বস্তি: দেশের সেচ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ ডিজেলচালিত। সুলভে ডিজেল পাওয়া গেলে কৃষকের উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমে আসবে।
ডলার সংকট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ: জ্বালানি আমদানির পেছনে প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, তা সাশ্রয় হলে দেশের ডলার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে। একই সাথে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের মাধ্যমে দূর হবে লোডশেডিং।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ১৯৮১ সালে যদি কূপটি সফলভাবে চালু করা যেত, তবে গত ৪৪ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার মতো উন্নত অর্থনীতির দেশ হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশ আরও অনেক দূর এগিয়ে থাকত। দেরিতে হলেও কানাইঘাটের এই খনিটি চালুর উদ্যোগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হতে পারে।
