নিজস্ব প্রতিবেদক :: কওমি মাদরাসা নিয়ে একমুখী প্রচারণায় উদ্বেগ, পর্যবেক্ষণ সেল ও হটলাইন চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি মাদরাসাসংশ্লিষ্ট কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিচালিত একমুখী প্রচারণায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ নেতৃবৃন্দ বলেছেন, একই সঙ্গে অভিযোগ যাচাই, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং কওমি মাদরাসাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তদারকি জোরদারের লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’ গঠন এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য হটলাইন চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
বুধবার (২৯ জুলাই ২০২৬) হাইয়ার অফিস ব্যবস্থাপক মাওলানা মু: অছিউর রহমান স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেসবজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
রাজধানী ঢাকায় আল-হাইআতুল উলয়ার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘কওমি মাদরাসা বিরোধী অপপ্রচার রোধ ও উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় আল-হাইআতুল উলয়ার করণীয়’ শীর্ষক সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভাটি আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান-এর নির্দেশক্রমে অনুষ্ঠিত হয়। এতে আল-হাইআতুল উলয়ার অধীন ছয়টি কওমি শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন আল-হাইআতুল উলয়ার কো-চেয়ারম্যান, বেফাকের সিনিয়র সহসভাপতি আল্লামা শেখ সাজিদুর রহমান।
সভায় বক্তারা বলেন, কোনো অপরাধ, অনিয়ম বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গণমাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা, লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকসমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সভায় বলা হয়, দেশের ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিক চরিত্র গঠন এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে কওমি মাদরাসার দীর্ঘদিনের অবদান রয়েছে। অথচ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়কে সমগ্র কওমি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আরোপ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে এবং কওমি মাদরাসা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে বলে সভায় অভিমত ব্যক্ত করা হয়।
সভায় দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, কোনো সংবাদ, ভিডিও, বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ কিংবা প্রচার করা উচিত নয়। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানানো হয়।
সভায় কওমি মাদরাসাসংক্রান্ত অভিযোগ, তথ্য-উপাত্ত, ফ্যাক্ট-চেকিং এবং সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্ট গ্রহণের জন্য ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ নম্বরে (হোয়াটসঅ্যাপ) একটি বিশেষ হটলাইন চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। এই নম্বরে মেসেজ, ভয়েস কল, ছবি, ভিডিও এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট পাঠানো যাবে।
সভায় আল-হাইআতুল উলয়ার অধীন ছয়টি বোর্ডের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’ গঠন করা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি বোর্ড নিজ নিজ অধিভুক্ত মাদরাসাসমূহের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথক ‘মাদরাসা মনিটরিং সেল’ গঠন করবে মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মাদরাসা পরিদর্শন ও মনিটরিং কার্যক্রম আরও জোরদার করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ ছাড়া কওমি মাদরাসাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা প্রদান এবং আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি ‘লিগ্যাল প্যানেল’ গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
সভায় গঠিত কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’-এর সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়েছেন আল্লামা সাজিদুর রহমান, মাওলানা মুফতি রুহুল আমীন, মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন আহমদ রাজু, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী, মাওলানা আব্দুল বছীর, মাওলানা মুফতি এনামুল হক, মাওলানা একরাম হোসাইন ওয়াদুদী, মাওলানা মুহসিন শরীফ এবং মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ আলী।
উপস্থিত প্রতিনিধিগণ কওমি মাদরাসার শিক্ষার মান, নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা, জবাবদিহিতা ও নৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার, তদারকি এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে যে কোনো অপরাধ, অনিয়ম ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর ও দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণের, পাশাপাশি মিথ্যা অপবাদ, মিডিয়া ট্রায়াল এবং চক্রান্তের শিকার নিরপরাধ শিক্ষক, মুহতামিম ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আইনগত প্রতিকার করারও প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
