৩৬নিউজ ডেস্ক: কওমি মাদ্রাসার প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি রক্ষা, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে ৬ দফা সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাতে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক খোলা চিঠির মাধ্যমে তিনি কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার শীর্ষ আলেম ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের প্রতি এই উদাত্ত আহ্বান জানান।
প্রকাশিত খোলা চিঠিতে শায়খ আহমাদুল্লাহ উল্লেখ করেন, কওমি মাদ্রাসা দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসছে এবং রাষ্ট্রীয় অনুদান ছাড়াই লাখ লাখ এতিম ও দুস্থ শিশুর ভরণ-পোষণের গুরুদায়িত্ব পালন করছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের প্রতি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের কিছু অভিযোগ কওমি অঙ্গনের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের ওপর নেতিবাচক ছায়া ফেলছে।
তিনি বলেন, ‘ইসলামে শিশুদের প্রতি কোমল আচরণের কঠোর নির্দেশ রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের যৌনচারকে কঠিন গোনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিছু তথাকথিত শিক্ষকের নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ড আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।’ একই সাথে সংবাদমাধ্যমের অতিরঞ্জন বা ষড়যন্ত্রের অজুহাত দেখিয়ে বিদ্যমান বাস্তব সমস্যাগুলোকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই বলেও সতর্ক করেন তিনি।
মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা ও শিশুদের সুরক্ষায় তিনি যে ৬টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন, সেগুলো হলো:
১. কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি গঠন: ‘আল-হাইআতুল উলয়া’র অধীনে শীর্ষ আলেম, আইনি বিশেষজ্ঞ ও মনস্তাত্ত্বিকদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা। কোনো প্রতিষ্ঠানে অনাচারের অভিযোগ উঠলে এই কমিটি নিরপেক্ষ তদন্ত চালিয়ে দোষীদের আইনের হাতে সোপর্দ করবে এবং তাদের নিয়ে একটি ‘সেন্ট্রাল ব্ল্যাকলিস্ট’ বা কালো তালিকা তৈরি করবে।
২. অভিযোগ গ্রহণ সেল ও হটলাইন: ভুক্তভোগী ও অভিভাবকদের অভিযোগ জানানোর জন্য গোপনীয়তা রক্ষাকারী একটি কেন্দ্রীয় হটলাইন সার্ভিস চালু করা এবং আক্রান্ত শিশুদের প্রয়োজনীয় মানসিক সাপোর্ট প্রদান করা।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সংস্কার: কওমি প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কক্ষ ও আবাসিক চত্বরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, শিশুদের মা-বাবার কাছে রেখে একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত অনাবাসিক শিক্ষায় উৎসাহিত করা এবং গণরুমের বিছানা পদ্ধতির পরিবর্তন আনা। পাশাপাশি শিক্ষকদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সেবা গ্রহণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা।
৪. শিক্ষক ও স্টাফদের মানোন্নয়ন: শিক্ষকদের জন্য কঠোর আচরণবিধি প্রণয়ন এবং শিশু মনস্তত্ত্ব ও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবাহিতদের অগ্রাধিকার প্রদান এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনের স্বার্থে ফ্যামিলি কোয়ার্টার বা নিয়মিত ছুটির বন্দোবস্ত করা।
৫. নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতিমালা: মহিলা মাদ্রাসাগুলো শতভাগ নারী কর্মকর্তা ও কর্মীদের দিয়ে পরিচালনা করা। সীমানা প্রাচীরের প্রধান ফটকের প্রহরী ছাড়া কোনো অবস্থাতেই পুরুষ শিক্ষক বা কর্মকর্তা রাখা যাবে না।
৬. অনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ: অপরিকল্পিত ও মানহীন প্রাইভেট মাদ্রাসাগুলোকে নির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় আনা এবং নতুন প্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা।
শায়খ আহমাদুল্লাহ তাঁর বার্তার শেষে বলেন, কওমি মাদ্রাসা মানুষের আত্মিক আশ্রয়ের শেষ স্থান। এই পবিত্র অঙ্গনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হলে আত্মপক্ষ সমর্থনের উর্ধ্বে উঠে আত্মসংশোধনের পথ বেছে নিতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শীর্ষ আলেমগণ কওমি শিক্ষার সার্বিক স্বার্থে এই প্রস্তাবনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।
টিএইচএ/
