জামায়াত ছেড়ে কওমি ধারার রাজনীতির সঙ্গে নতুন সমীকরণে এনসিপি

by hsnalmahmud@gmail.com

চিফ রিপোর্টার:: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একসঙ্গে পথ চলার পর এবার কি তবে ভাঙনের সুর বাজছে? রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো গুঞ্জন উঠেছে—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কওমি ঘরানার ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি ও বৃহত্তর জোট গঠনের সম্ভাবনাই এখন রাজনৈতিক আলোচনায় মুখ্য হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আসন সমঝোতা ও কৌশলগত মতপার্থক্যই এই দূরত্বের মূল কারণ। খুব শিগগিরই এই জোটত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন
banner

সিটির মেয়র পদে মুখোমুখি অবস্থান

আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই দলের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব এখন প্রকাশ্যে। ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ দেশের প্রধান ছয়টি সিটিতে মেয়র পদে এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি।

অন্যদিকে, জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে একক প্রার্থিতা ঘোষণা না করলেও সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) দলের পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েমের নাম সামনে এনেছে। অথচ একই পদে এনসিপি আগেই তাদের দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা করেছিল। একই পদে দুটি প্রধান শরিক দল মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ায় সমঝোতার পথ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি; বিষয়টি পরে জানাবেন বলে এড়িয়ে যান। তবে সম্প্রতি জামায়াত-সমর্থিত সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, “এনসিপিকে বিদায় জানানোর সময় হয়েছে।” এ নিয়ে উভয় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও শুরু হয়েছে তুমুল চর্চা।

সংসদ নির্বাচনের সমীকরণ থেকে স্থানীয় সরকারের হিসাব

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তরুণদের দল এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামী কৌশলগত জোটে আবদ্ধ হয়েছিল। সারা দেশে এককভাবে সাংগঠনিক ভিত্তি ও নির্বাচন পরিচালনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ঐক্যের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেছিল এনসিপি। তবে সংসদ নির্বাচনের সেই বৈতরণী পার হওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে সেই জোটে ফাটল ধরতে শুরু করেছে।

এনসিপির তৃণমূল ও অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, দীর্ঘমেয়াদে দেশের রাজনীতিতে স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায় দলটি। একই সঙ্গে কওমি ঘরানার দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সাধনের পাশাপাশি এককভাবে নিজস্ব জনভিত্তি যাচাই করতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত জানান, তারা স্বতন্ত্রভাবেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং চূড়ান্ত সময়ে দলীয় ফোরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করবেন।

কওমি ঘরানার সঙ্গে নতুন সমীকরণ

এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারিং ফোরাম ‘রাজনৈতিক পর্ষদের’ এক সদস্য জানান, “কওমি ঘরানার কয়েকটি দলের সঙ্গে সংস্কার, বিচার ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। জামায়াতের জোটে থাকা বা বেরিয়ে আসার লাভ-ক্ষতিও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। জুলাইয়ের কর্মসূচি শেষ হলে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।”

এই নতুন সমীকরণের পটভূমি তৈরি হচ্ছে কওমি ধারার নেতাদের তৎপরতাতেই। গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে সাতটি ইসলামি দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট ও নেজামে ইসলাম পার্টির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠক থেকে আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে প্রতিটি দলকে রাজনৈতিক অবস্থান ও ঐক্যের রূপরেখা লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে কথা বলেছেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এর আগে তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

এই সাক্ষাৎ ও বৈঠকগুলো নতুন জোটের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করলেও আসিফ মাহমুদ বলেন, “বিভিন্ন আলেম ও রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো সমন্বয়ের বিষয় থাকলে সেটি দলীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই হবে।”

দলে দ্বিধা ও অমীমাংসিত অবস্থান

জোটের বিষয়ে এনসিপির ভেতরের বক্তব্যে কিছু দ্বিমুখী সুরও দেখা যাচ্ছে। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনা চলছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা জোটের পক্ষে।”

অন্যদিকে, এনসিপির মিডিয়া উপকমিটির সদস্য ইয়াসির আরাফাত জোটত্যাগের আলোচনার বিষয়টি এখনো অনানুষ্ঠানিক উল্লেখ করে বলেন, “আমাদের কাছে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবরটি দেখছি। দল থেকে এখনো এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, আমরা ১১-দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছি।”

সব মিলিয়ে, এনসিপি কি জামায়াতের হাত ধরে ১১-দলীয় জোটে থাকবে নাকি কওমি ঘরানার দলগুলোকে নিয়ে নতুন কোনো মেরুকরণ তৈরি করবে—তার জবাব মিলবে আগামী কয়েক দিনের ভেতরেই।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222