মসজিদ-মাদরাসার পর এবার ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়ও টার্গেটে!

by hsnalmahmud@gmail.com

বিশেষ প্রতিবেদক:: ভারতের উত্তরপ্রদেশের ঐতিহাসিক মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর প্রশাসন যে নির্দেশ জারি করেছে, তা কেবল একটি আইনি বা প্রশাসনিক বিষয় নয়; বরং ভারতীয় মুসলিমদের ওপর এটি চলমান মানসিক ও সামাজিক হামলারই আরেকটি বড় উদাহরণ বলে মনে করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মোহাম্মদ হাসান শরীফ।

এক সংবাদ বিশ্লেষণে তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষমতাসীন দল বিজেপির এবারের মূল টার্গেট হচ্ছে উত্তরপ্রদেশের এই ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়টি। নিয়ম না মানার অজুহাত তুলে উত্তরপ্রদেশ প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টিই আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি কর্তৃপক্ষ নিজেরা না ভাঙলে প্রশাসন নিজেই তা গুঁড়িয়ে দিয়ে তার যাবতীয় ব্যয়ভার বিশ্ববিদ্যালয়কেই বহন করতে হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

মোহাম্মদ হাসান শরীফ আলজাজিরার সূত্রের বরাতে জানান, ভারতের রাজধানীতে যখন ‘ককরোচ’ আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, ঠিক তখনই নয়াদিল্লি থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি রক্ষার জন্য শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা ধর্মঘট চালাচ্ছিলেন। কিন্তু রাজপথের সেই আন্দোলনকে প্রশাসন কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়টির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে হাসান শরীফ বলেন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মহান নেতা মোহাম্মদ আলী জওহরের নামে এই প্রতিষ্ঠান। তাঁর পরিচালিত খেলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে মহাত্মা গান্ধী সর্বভারতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি পেয়েছিলেন। সেই মহান নেতার স্মৃতি ধরে রাখতে সমাজবাদী দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আজম খান ২০০৩ সালে ট্রাস্ট গঠন করেন এবং ২০০৬ সালে ২৫০ একরের বিশাল ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে তোলেন।

তাঁর মতে, উত্তরপ্রদেশের ৩ কোটি ৮০ লাখ মুসলিম ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল উচ্চশিক্ষার প্রধান অবলম্বন। কেননা এর শিক্ষার্থীদের অর্ধেকের বেশিই ছাত্রী। যোগী আদিত্যনাথ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আজম খানের ওপর প্রায় ১০০টি মামলা দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়া হলেও, শেষ পর্যন্ত যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে টার্গেট করা হবে—তা কেউ ভাবেনি। এখন এটি গুঁড়িয়ে দেওয়া মানে হাজার হাজার ছাত্রীর শিক্ষাজীবন চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়া।

তিনি আরও পর্যবেক্ষণ করেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মসজিদ-মাদরাসা ভাঙা, নাম পরিবর্তন কিংবা সামান্য অজুহাতে বুলডোজার চালানো—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ভারতীয় সমাজ থেকে মুসলিমদের পুরোপুরি ‘অদৃশ্য’ করার একটি পরিকল্পিত নীলনকশা।

ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের আলোকে তিনি বিশ্লেষণ করে বলেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে অবদমিত করার জন্য তাদের খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি বা গর্বের প্রতীককে হাতিয়ার বানানোর ইতিহাস বৈশ্বিকভাবেই অত্যন্ত পুরোনো:

ড. বি আর আম্বেদকরের বিশ্লেষণ: ড. আম্বেদকর তাঁর গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন যে প্রাচীন ভারতে দলিতদের মূলধারা থেকে আলাদা করতে ‘মৃত গরুর মাংস খাওয়া’কে অজুহাত করা হয়েছিল।

ইতিহাসবিদ ডি এন ঝার গবেষণা: ইতিহাসবিদ ঝা প্রমাণ করেছেন কীভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে খাবারকে একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণার হাতিয়ার বা ‘অন্যকরণ’ (আদারিং)-এর রাজনীতিতে রূপ দেওয়া হয়।

বৈশ্বিক উদাহরণ: স্প্যানিশ ইনকুইজিশনে ইহুদি ও মুসলিমদের শুয়োরের মাংস খেতে বাধ্য করা, যুক্তরাষ্ট্রে আদিবাসীদের খাদ্য সংকট তৈরি করতে ‘বাইসন’ শিকার নিষিদ্ধ করা কিংবা দাসপ্রথার যুগে কৃষ্ণাঙ্গদের নিজস্ব ভাষা ও ড্রাম বাজানো নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে শাসকশ্রেণি সবসময় অবদমিতদের মানসিকভাবে পঙ্গু করতে চেয়েছিল।

সবশেষে বিশিষ্ট সাংবাদিক মোহাম্মদ হাসান শরীফ জোর দিয়ে বলেন, শাসক বা আধিপত্যশীল গোষ্ঠী যখন কোনো সমাজকে দমন করতে চায়, তখন তারা সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে ‘সাংস্কৃতিক অপরাধীকরণের’ পথ বেছে নেয়। মানুষের খাদ্যাভ্যাস, উৎসব, পোশাক বা গর্ব করার মতো অনন্য স্থাপনাগুলোকে যখন বিলীন করে দেওয়া হয়, তখন পুরো সমাজটিই অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। সুতরাং, মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮টি ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ সেই সুপ্রাচীন ‘সাংস্কৃতিক অপরাধীকরণেরই’ এক আধুনিক রূপ।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222