বিশেষ প্রতিবেদক:: নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম দেওভোগ মাদ্রাসায় বেশ কিছুদিন ধরে চলা চরম উত্তেজনা, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও অভ্যন্তরীণ সংকটের অবসান ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও আন্দোলনের মুখে অবশেষে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা আবু তাহের জিহাদী। তবে এর আগে গত রবিবার (৫ জুলাই) দিনভর মাদ্রাসাটিতে ব্যাপক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, বহিরাগতদের আনাগোনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, প্রত্যক্ষদর্শী ও অভ্যন্তরীণ সূত্রে এই সংকটের নেপথ্যের আসল কারণ এবং ঘটনার দীর্ঘ ধারাবাহিকতা জানা গেছে।
সংকটের সূত্রপাত: শিক্ষক অব্যাহতি
ঘটনার শুরু গত ৩০ জুন। ওই দিন মাদ্রাসার নির্বাহী পরিষদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জানা যায়, বৈঠকে মুহতামিম মাওলানা আবু তাহের জিহাদী ও মাদ্রাসার দীর্ঘদিনের প্রবীণ শিক্ষক ও মসজিদের খতিব মাওলানা হারুনুর রশীদ সাহেবের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে আলোচনা হয়। একপর্যায়ে মাদ্রাসার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত তিনজন শিক্ষককে বৈঠক থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে মাওলানা হারুনুর রশীদ সাহেবকে মাদ্রাসা ও মসজিদের খতিবের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই অব্যাহতির পেছনে মাওলানা ফেরদাউসসহ কয়েকজন শিক্ষক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও উপস্থাপনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
‘ছায়া কমিটি’ ও ছাত্রদের অসন্তোষ
মাওলানা হারুনুর রশীদকে অব্যাহতির পর থেকেই মাদ্রাসার ভেতরে এক ধরণের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এর প্রায় পাঁচ দিন পর মুহতামিম ও তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষকের কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মাদ্রাসার ভেতরে ‘বাংলাদেশ কওমি ছাত্রপরিষদ’-এর একটি গোপন ছায়া কমিটি সক্রিয় রয়েছে। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে এই কমিটির সংশ্লিষ্টদের অপসারণ এবং সংগঠনটির উপদেষ্টা তথা মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা আবু তাহের জিহাদীর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে।
এরই মধ্যে ছায়া কমিটির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর মাদ্রাসার কয়েকজন সিনিয়র উস্তাদ শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানান। এর জেরে মুহতামিমের স্বাক্ষর করা নোটিশে ওইসব প্রবীণ উস্তাদদেরও নোটিশ দিয়ে অব্যাহতি দেওয়া হয়। শ্রদ্ধেয় উস্তাদদের এমন অপমান ও জুনিয়র শিক্ষকদের অসৌজন্যমূলক আচরণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং তারা অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে।

রবিবার দিনভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষ
রবিবার (৫ জুলাই) আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে দেওভোগ মাদ্রাসা এলাকায় অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। দিনের একপর্যায়ে মাদ্রাসার প্রধান ফটকের বাইরে ‘এলাকাবাসী’ পরিচয়ে কিছু লোকের জমায়েত হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, তাদের ওপর হামলা করার উদ্দেশ্যে সেখানে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরাও অবস্থান নিয়েছিল। সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসার প্রধান ফটক বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান নেন।
এই চলমান উত্তেজনার মধ্যে সংঘর্ষে নারায়ণগঞ্জ মহানগর হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মীর আহমদ উল্লাহ ফুয়াদ আহত হন। অভিযোগ উঠেছে, এই হামলায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা জড়িত ছিলেন। আহত ফুয়াদকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এমন পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আলোচিত নেতা জাকির খান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নিতে এবং তাদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে মাদ্রাসায় যান।
সমাধান ও মুহতামিমের পদত্যাগ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং মাদ্রাসার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে পরবর্তীতে সেখানে উপস্থিত হন মুফতি মনির কাসেমী, স্থানীয় ব্যক্তিত্ব জাকির খান, মাওলানা ফেরদাউসসহ মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতা।
শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে এবং দীর্ঘ আলোচনার পর তাঁদের দাবি মেনে নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির সমাধান করা হয়। এই সমঝোতার অংশ হিসেবে একটি লিখিত নোটিশ বা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয় যে, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে চলমান নিয়মভঙ্গের দায়ে মুহতামিম মাওলানা আবু তাহের জিহাদীকে মাদ্রাসার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি (পদত্যাগ) দেওয়া হলো। (সংযুক্ত হস্তলিখিত বিজ্ঞপ্তির চিত্র: image_d05ee0.jpg)।
বর্তমান পরিস্থিতি ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী:
মাওলানা হারুনুর রশীদ সাহেবকে সসম্মানে তাঁর স্বপদে পুনর্বহাল করা হচ্ছে। আগামী ৩ দিনের মধ্যে পরিচালনা পরিষদ শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত কওমি ছাত্রপরিষদ সংক্রান্ত অভিযোগসহ অন্যান্য দাবিগুলো বিবেচনা করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
মুহতামিমের পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, তা কার্যনির্বাহী কমিটির সভার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং প্রিয় প্রতিষ্ঠান ও সম্মানিত শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার্থেই তারা এই আন্দোলনে নেমেছিলেন। বর্তমানে দেওভোগ মাদ্রাসার পরিবেশ শান্ত রয়েছে।
