খেলাপি ঋণের ১ লাখ কোটি টাকার সুদ মওকুফের সুযোগ দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

by Abid vs36

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণ ও ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট সাফসুতরো করতে ঋণখেলাপিদের জন্য বড় ধরনের সুদ মওকুফের সুযোগ সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৪ সাল থেকে বিশেষ পুনঃতফসিল নীতির আওতায় নিয়মিত করা অধিকাংশ ঋণ আবারও খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত সোমবার জারি করা এক সার্কুলারে ব্যাংকগুলোকে ঋণগ্রহীতাদের চার্জড (আরোপিত) ও আনচার্জড (অনারোপিত) উভয় ধরনের সুদ মওকুফের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সুদ মওকুফের আগে ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল খরচ (কস্ট অব ফান্ড) আদায় নিশ্চিত করার যে দীর্ঘদিনের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল, তা শিথিল করা হলো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর স্থগিত সুদ হিসাবে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার আনচার্জড বা অনারোপিত সুদ জমেছিল। মন্দ ঋণ চিরতরে মুছে ফেলে খেলাপিদের দায়মুক্ত করতে এবং ব্যাংকের আর্থিক খতিয়ান ভালো দেখাতেই এই নতুন কৌশল নেওয়া হয়েছে। সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত যারা বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা পেয়েছেন, তারাও এই সুদ মওকুফের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন। এই নীতির আওতায় খেলাপিরা কেবল ঋণের আসল বা প্রিন্সিপাল টাকা পরিশোধ করে এককালীন নিষ্পত্তি করার সুযোগ পাবেন, যার অর্থ তাদের কোনো সুদ দিতে হবে না। ব্যাংকগুলো যদি স্থগিত সুদ হিসাব থেকে ১ লাখ কোটি টাকার অনারোপিত সুদ মওকুফ করে, তবে মোট খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের রেকর্ড ৩০.৬০ শতাংশ থেকে কমে একলাফে ২৫ শতাংশে নেমে আসবে।

বিজ্ঞাপন
banner

এই সার্কুলার জারির আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। সেখানে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে আসল ও সুদ মওকুফ উভয় বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। তবে ব্যাংকগুলো আসল বা প্রিন্সিপাল ঋণ মওকুফের তীব্র বিরোধিতা করেছে, কারণ এটি ব্যাংক কোম্পানি আইনের পরিপন্থী। কিন্তু সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে থাকা অনারোপিত সুদ মওকুফের বিকল্পটি তারা মেনে নিয়েছে, যেহেতু এগুলো এখনো ব্যাংকের অর্জিত আয় হিসেবে যুক্ত হয়নি। শীর্ষ নির্বাহীরা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল করা ঋণ ও অবলোপন করা (রাইট-অফ) ঋণসহ দেশের মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০.৮৭ লাখ কোটি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের ৬০ শতাংশ। মূলত আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচির দরকষাকষির আগেই যেকোনো উপায়ে খেলাপি ঋণের হার কমিয়ে আনতে চাইছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত অনৈতিক একটি কাজ করছে। আমানতকারীদের টাকা ক্ষমা করার অধিকার কারও নেই। সুদ মওকুফ করার এই ব্যাংকগুলো কে? এই টাকার আসল মালিক তো আমানতকারীরা। তারা তো এই ঋণ মাফ করেননি, তবুও ব্যাংকগুলোকে সুদ মওকুফের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এটিকে কোনোভাবেই যৌক্তিক বলা যায় না। এর ফলে ভালো গ্রাহকেরা নিরুৎসাহিত হবেন এবং বড় খেলাপিরা আরও বেশি সুবিধা পেতে উৎসাহিত হবে।

অনুরূপ উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ (রুমি) আলী বলেন, ব্যাংকগুলো যদি ইতোমধ্যে আয় হিসেবে বুক করা সুদ মওকুফ করে, তবে আগামী বছরগুলোতে তাদের এই ক্ষতি মেনে নিতে হবে। বড় মন্দ ঋণের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ সুদ মওকুফ করা হলে ব্যাংকগুলোর আয় এবং মূলধন পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের ঝুঁকির মুখে ফেলবে। তিনি বড় খেলাপিদের দেশে ও বিদেশে গড়ে তোলা সম্পদ খুঁজে বের করে আইনি প্রক্রিয়ায় আনার তাগিদ দেন।

একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, যদি স্থগিত সুদের বিপরীতে ইতোমধ্যে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখা হয়ে থাকে, তবে মওকুফের ফলে মুনাফায় তেমন বড় প্রভাব পড়বে না। তবে প্রভিশন না থাকলে ২০২৬ সালে ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা সরাসরি কমে যাবে এবং কর ব্যবস্থার ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাঁর মতে, বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করা কেবল সমস্যাটিকে সাময়িক এড়িয়ে যাওয়া, কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ব্যাংকিং খাতের সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠন করা জরুরি, যা ছাড়কৃত মূল্যে সংকটাপন্ন সম্পদ কিনে ব্যাংকগুলোকে সচল করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংকগুলো ২০২৪ এবং ২০২৫ এই দুই বছরেই ২.৫৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে, যার ৪০ শতাংশই আবার খেলাপি হয়ে গেছে। ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি কোম্পানিগুলোর মূলধন সংকট ও ঋণ-ইকুইটি অনুপাত ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও তাদের ব্যবসার কাঠামোগত সংস্কার না করে কেবল গ্রেস পিরিয়ড ও পুনঃতফসিলের সুবিধা দেওয়ার কারণেই এই পলিসি বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নতুন ছাড় দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

টিএইচএ/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222