পবিত্র নামাজ আদায়ের সময় অনেকের মনেই বিভিন্ন ধরনের এলোমেলো বা জাগতিক চিন্তা ভর করে। এটি সাধারণ মুসল্লিদের অন্যতম এক বড় সমস্যা। এই বিষয়টি কতটা স্বাভাবিক এবং এমন পরিস্থিতিতে একজন ইবাদতকারীর করণীয় কী? ইসলামি শরিয়তের আলোকে সেই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট ইসলামি স্কলাররা।
বিজ্ঞ আলেমদের মতে, নামাজ আদায়ের অন্যতম প্রধান শর্ত ও আদব হলো পূর্ণ একাগ্রতা, মনোযোগ এবং পরম বিনয়-নম্রতার সঙ্গে তা সম্পন্ন করা। নামাজে দাঁড়িয়ে একজন মুসল্লির মনে সর্বদা এমন গভীর অনুভূতি থাকা উচিত যেন তিনি স্বয়ং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে দেখছেন। যদি আধ্যাত্মিকতার সেই স্তরে পৌঁছানো সম্ভব না হয়, তবে অন্তত অন্তরে এই দৃঢ় বিশ্বাস বা ধারণা রাখা একান্ত জরুরি যে, নিখিল বিশ্বের পালনকর্তা আল্লাহ তাকে প্রত্যক্ষ করছেন এবং তিনি সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে একান্ত কথোপকথনে লিপ্ত রয়েছেন।
তবে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির কারণে নামাজের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে মনে বিভিন্ন এলোমেলো চিন্তা বা দুনিয়াবি বিষয় চলে আসা মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ ধরনের অবাঞ্ছিত চিন্তা মনের মণিকোঠায় চলে এলে তা নিয়ে ঘাবড়ে না গিয়ে, সঙ্গে সঙ্গে সচেতনভাবে আবার নামাজের দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং যতটা সম্ভব অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা দূরে সরিয়ে রাখার আন্তরিক চেষ্টা চালাতে হবে। ইসলামি স্কলাররা অভয় দিয়ে বলেন, অনবরত চেষ্টা করার পরও যদি মনের অজান্তে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো চিন্তা মাথায় চলে আসে, তবে সে জন্য কোনো গুনাহ হবে না এবং নামাজও বাতিল হবে না। তবে মনে পড়ার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে দুনিয়াবি চিন্তা লালন করা বা মনোযোগ ফিরে পাওয়ার পরও ইচ্ছা করে সেই ভাবনায় ডুবে থাকা মোটেও ঠিক নয়। এতে নামাজের মূল আধ্যাত্মিক সওয়াব ও ফজিলত অনেকাংশে কমে যায়।
নামাজে পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে ইসলামি চিন্তাবিদগণ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতার প্রতি সর্বোচ্চ যত্নবান হতে হবে। অর্থাৎ নামাজের পূর্বে ইস্তিঞ্জা ও অজু সুনির্দিষ্ট সুন্নত ও আদব অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে এবং পরিধেয় কাপড়-চোপড়ের পবিত্রতা নিখুঁতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জামাত শুরুর পর্যাপ্ত সময় আগে মসজিদে যাওয়া উত্তম। ফরজ নামাজের আগে সুন্নত নামাজ আদায় করে একাগ্রতার সঙ্গে অপেক্ষা করার সময় আল্লাহর মহিমা ও সুউচ্চ মর্যাদার কথা মনে করা উচিত। মনে মনে এই চিন্তা জাগ্রত করা দরকার যে, আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই মহাবিশ্বের একমাত্র সৃষ্টিকর্তার শাহী দরবারে হাজিরা দিতে যাচ্ছি। তৃতীয়ত, প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাজকে জীবনের শেষ নামাজ মনে করা উচিত। নামাজে দাঁড়িয়ে ভাবা দরকার, এটিই হয়তো আমার জীবনের শেষ সুযোগ এবং এরপর হয়তো তওবা বা ইবাদতের আর কোনো সময় নাও পেতে পারি।
চতুর্থত, কেরাত ও তাসবিহর প্রতি গভীর মনোযোগ দেওয়া জরুরি। নামাজে যা মুখে পাঠ করা হয়, তার প্রতিটা শব্দ ও অন্তর্নিহিত অর্থের দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের সময় আয়াতের অর্থ নিয়ে চিন্তা করা এবং রুকু-সিজদাসহ অন্যান্য অবস্থায় যে তাসবিহ পাঠ করা হয়, তার গূঢ় অর্থ হৃদয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করা উচিত। বিশেষ করে সুরা ফাতেহা পড়ার সময় আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বর্ণিত একটি পবিত্র হাদিসে কুদসি মনে রাখা যেতে পারে। যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা বলেন, আমি নামাজ অর্থাৎ সূরা ফাতেহাকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে দুই ভাগে ভাগ করেছি। বান্দা যখন বলে ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’, তখন আল্লাহ পরম সন্তুষ্টি নিয়ে বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। বান্দা যখন বলে ‘আর রাহমানির রাহিম’, তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার গুণগান করেছে। যখন বান্দা বলে ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দিন’, তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার মহিমা বর্ণনা করেছে। এরপর বান্দা যখন বলে ‘ইইয়াকা নাবুদু ওয়া ইইয়াকা নাস্তাঈন’, তখন আল্লাহ বলেন, এটি আমার ও আমার বান্দার মধ্যকার বিষয় এবং বান্দা যা চেয়েছে তা তাকে দেওয়া হবে। আর যখন বান্দা বলে ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম’, তখন আল্লাহ বলেন, এটি সম্পূর্ণ আমার বান্দার জন্য এবং সে যা প্রার্থনা করেছে তা সে অবশ্যই পাবে। নামাজে সুরা ফাতেহা পাঠের সময় মহান আল্লাহর এই প্রত্যুত্তরের কথা মনে রাখলে মনোযোগ বিচ্যুত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।
পঞ্চমত, নামাজের প্রতিটি রুকন আদায়ের সময় তার সুন্নত ও সুনির্দিষ্ট আদবগুলো নিখুঁতভাবে খেয়াল রাখা উচিত। যেমন রুকু অবস্থায় নিজের দৃষ্টি পায়ের আঙুলের দিকে রাখা, দুই কনুই শরীর থেকে কিছুটা আলাদা রাখা, হাতের আঙুল দিয়ে হাঁটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরা এবং পিঠ এমনভাবে সোজা ও ঝুঁকে রাখা যাতে মাথা ও পিঠ সমান্তরাল থাকে। সিজদার সময়ও দৃষ্টির সীমানা নাকের ডগায় রাখা উচিত। সর্বোপরি, নামাজের একটি আমল বা রুকন শেষ হওয়ার সাথে সাথেই পরবর্তী আমলের দিকে মনকে অগ্রিম প্রস্তুত রাখা দরকার, যাতে ধারাবাহিকভাবে নামাজের সব রুকন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা যায়। ইসলামি স্কলারদের মতে, এসব আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক বিষয়ের প্রতি নিয়মিত যত্নবান হলে ইনশাআল্লাহ নামাজে পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখা অত্যন্ত সহজ হবে। শুরুতে কিছুটা মানসিক চেষ্টা ও নিয়মিত অনুশীলনের প্রয়োজন হলেও ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় এবং একসময় মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা চিরতরে কমে আসে।
টিএইচএ/
