জুলাই যোদ্ধা ও জুলাইয়ে শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের (বিপিসি) সব হোটেল-মোটেল ও অন্যান্য সেবায় ৩৬ শতাংশ ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে।
পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং তাদের ভ্রমণে বিমানভাড়ায় বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) জুলাই অভ্যুত্থান দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন আয়োজিত ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সম্মাননা ও আলোচনা’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান বলেন, জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা পর্যটন করপোরেশনের আওতাধীন সব হোটেল-মোটেলসহ বিভিন্ন সেবায় ৩৬ শতাংশ ছাড় পাবেন। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে পর্যটন করপোরেশন কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে জুলাই যোদ্ধা ও জুলাই শহীদ পরিবারের পাঁচজন করে মোট ১০ জন জুলাইয়ের আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করেন। তারা আন্দোলনের সময়ের বিভিন্ন ঘটনা, ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের মূল্যায়ন ও সম্মান দিতে হবে। শুধু একটি অনুষ্ঠান করে জুলাইয়ের স্মৃতিকে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; শহীদ ও আহতদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ছোট ছোট সন্তানরা দেশপ্রেম কী, দেশকে কীভাবে ভালোবাসতে হয় এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কীভাবে আন্দোলন করতে হয়—জুলাইয়ের আন্দোলন থেকে এসব শিক্ষা পেয়েছে। তাই আমাদের এই ইতিহাস চিরদিন মনে রাখতে হবে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘যিনি তার স্বজনকে হারিয়েছেন, তার পরিবার কীভাবে চলবে, তার সন্তানরা কীভাবে বড় হবে—সেটা আমাদের ভাবতে হবে। যিনি স্বামী হারিয়েছেন, তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা কীভাবে করা যায়, আর যে বাবা সন্তান হারিয়েছেন, তার পরিবারের জীবনযাপন কীভাবে চলবে—এসব বিষয়ও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।’
জুলাই যোদ্ধাদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে চাকরির জন্য সার্কুলার হয়েছে। যোগ্যতা অনুযায়ী জুলাই যোদ্ধাদের সেই সার্কুলারে আবেদন করার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই যোদ্ধাদের জন্য বিমানভাড়ায় বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথাও জানান আফরোজা খানম রিতা। তিনি বলেন, ‘৩৬ শতাংশ ডিসকাউন্টের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, আমি তার সঙ্গে একমত। এটি জুলাই যোদ্ধাদের প্রাপ্য। তারা যেখানে যেতে চান, সেখানে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। দেশ বিদেশে বিভিন্ন স্থানে যেতে তাদের বিমানভাড়ায় বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়েও আমরা কাজ করব। জুলাই যোদ্ধাদের জন্য বিমানভাড়ায় ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, জুলাইয়ে আহত এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এখানে আছেন, তাদের অনেক সুযোগ আছে চাকরি দেওয়ার। জুলাইয়ে আহত দ্বিতীয়, তৃতীয় এমনকি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের চাকরির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে জুলাইয়ে শহীদ পরিবারের সদস্য বা স্বজনদের চাকরির ক্ষেত্রে কিছুটা সুযোগ করে দেওয়া যায়।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারলে আমাদেরও মনে শান্তি আসবে যে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের জন্য আমরা কিছু করতে পেরেছি। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এবং চেয়ারম্যান পর্যায়ের কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারেন। প্রয়োজনে তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা রেখে চাকরির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, যারা জুলাইয়ের আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছেন, তারা হয়তো এসব উদ্যোগের সুফল বুঝতে পারবেন না। কিন্তু তাদের পরিবারগুলো অন্তত বুঝতে পারবে যে সরকার শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কথা মনে রাখে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহমান সাকি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যে বৃহত্তর ঐক্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘একটি দেশে যখন জনগণের উত্থান ঘটে, তার পেছনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও নির্যাতনের ইতিহাস থাকে। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিস্ট সরকারের অত্যাচার, নিপীড়ন, হামলা ও হত্যার কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।’
সাকি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের বিভাজন কাটিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। যার যার অবস্থান থেকে আন্দোলন হলেও সবার অভিমুখ ছিল এক।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, ছাত্ররা যখন রাস্তায় নামে, তখন জনগণের একটি বড় অংশ তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। কারণ ছাত্ররা আমাদের সন্তান। আর যখন ছাত্রের বুকে গুলি লাগে, এ দেশের মানুষ ঘরে বসে থাকে না।’
সাকি আরও বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে ছাত্র, তরুণ, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। তাঁদের ত্যাগের মধ্য দিয়েই জনগণের বৃহত্তর ঐক্য তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিদের পাশাপাশি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আক্তার, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও পর্যটন করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
