তিন দেশের প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা যফর আহমদ উসমানী (রহ.)

by hsnalmahmud@gmail.com

তিনটি দেশের শীর্ষ আলিম আল্লামা যফর আহমদ উসমানী (রহ.) বলেন; “আলেমদের রাজনীতি হওয়া উচিত উম্মতের ইমান ও স্বার্থ রক্ষার জন্য, কোনো নির্দিষ্ট শাসক বা শক্তির তোষামোদি করার জন্য নয়। শাসক যদি পথ হারায়, তবে সত্য উচ্চারণ করাই আলেমের প্রথম ফরজ।”

ভারতের ইউপি রাজ্যের দেওবন্দে এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে ১৮৯২ সালে জন্ম নেন আল্লামা যফর আহমদ উসমানী (রহ.)। তাঁর সম্পূর্ণ নসবনামা পিতার দিক থেকে সাহাবি হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) পর্যন্ত পৌঁছায়।

বিজ্ঞাপন
banner

মাত্র ৩ বছর বয়সে তাঁর মাতা ইন্তেকাল করলে প্রমাতামহী তাঁকে লালন-পালন ও প্রাথমিক নীতিশিক্ষায় বড় করে তোলেন। ৫ বছর বয়সে কুরআন মাজিদ হিফজ ও কিরাআত শুরু করেন এবং ৭ বছর বয়সে মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর পিতা মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াসিন (রহ.)-এর নিকট উর্দু, ফারসি ও গণিত শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাঁর আপন মামা, হাকীমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর সার্বিক শিক্ষা, গবেষণা ও আত্মিক গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তিনি কানপুরের জামিউল উলূমে ভর্তি হন এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সেই দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। এরপর হাকীমুল উম্মত থানভী (রহ.) তাঁকে তৎকালীন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও বুযুর্গ মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.)-এর খেদমতে মাজাহিরুল উলূমে পাঠিয়ে দেন। সেখানে তিনি আরও দুই বছর অবস্থান করে পুনরায় সহিহ বুখারি অধ্যয়ন করেন এবং হাদিস শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ কিতাবসমূহে উচ্চতর দক্ষতা অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবন সমাপ্ত হওয়ার পরপরই মাজাহিরুল উলূমে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সেখানে দীর্ঘ সাত বছর মিশকাত পর্যন্ত বিভিন্ন কিতাবের দরস প্রদান করেন। সে সময় তাঁর ছাত্রদের মধ্যে পরবর্তীকালের প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস মাওলানা বদরে আলম মিরাঠী (রহ.), মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.) এবং মাওলানা মুহাম্মদ ইদরিস কান্ধলভী (রহ.)-এর মতো মনীষীরাও ছিলেন।
সাত বছর পর হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর নির্দেশে তিনি থানাভবনে ফিরে আসেন। সেখানে প্রথমে হযরতের মালফুযাত লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করেন। পরে থানভী (রহ.)-এর পক্ষ থেকে ফতোয়া লেখার গুরুদায়িত্বও তাঁর ওপর অর্পিত হয়। একই সময়ে থানাভবনের নিকটবর্তী মাদরাসা ইরশাদুল উলূমে সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ হাদিসের প্রধান কিতাবসমূহের দরস প্রদান শুরু করেন।

১৩৩৯ হিজরিতে তিনি দরস, তাদরিস ও তাসনিফে ব্যস্ত থাকাকালে বার্মা থেকে একদল মুসলিম ব্যবসায়ী থানভী (রহ.)-এর নিকট এসে তাঁদের দেশে একটি দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য একজন যোগ্য আলেমের আবেদন জানান। সে সময় আলেমদের প্রচণ্ড প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও থানভী (রহ.) যফর আহমদ উসমানী (রহ.)-কে বার্মায় পাঠিয়ে দেন। তিনি ইয়াঙ্গুনের উপকণ্ঠে রান্ধের নামক স্থানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে আড়াই বছর শিক্ষকতা করেন। এ সময় রেঙ্গুনসহ বার্মার বিভিন্ন অঞ্চলে দ্বীনি শিক্ষা বিস্তার, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা এবং ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জন্য উচ্চ শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেসময় উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণার প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হত।

সূচনালগ্নেই সেখানে মাওলানা ইসহাক বর্ধমানী রহ. কে ইসলামী স্টাডিজ ও আরবি বিভাগের প্রধান বানিয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়। যিনি যফর আহমদ উসমানীর পরামর্শদাতা মুরুব্বি ও শিক্ষক ছিলেন।

১৯৩৮ সালে মাওলানা ইসহাক রহ. এর ইন্তেকাল হলে যফর আহমদ উসমানী রহ এর ডাক পড়ে উস্তাদের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য। এরপর থেকে ইংরেজদের শাসনমুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে নিয়জিত ছিলেন। একই সময়ে তিনি বড় কাটারা মাদরাসায় সহিহ বুখারি, মুয়াত্তা ইমাম মালিক, মসনবী ও তাফসিরে বাইযাবীর দরস প্রদান করেন। তাঁর ছাত্রদের অনেকেই পরবর্তীকালে উপমহাদেশের খ্যাতিমান মুহাদ্দিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

১৯৪৮ সালে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন দ্বীনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলকাতা আলিয়া মাদরাসার একটি ভাগ নিয়ে আসা হয় রাজধানী ঢাকায়। এর প্রধান হওয়ার জন্য মাওলানা যফর আহমদ উসমানীকে অনুরোধ জানানো হয়।

১৯৪৭ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি ঐতিহাসিক সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা-এর সদরুল মুদাররিসীন (হেড মাওলানা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে আলিয়া মাদরাসায় দ্বীনি শিক্ষার নতুন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ঢাকায় অবস্থানকালে আল্লামা আতাহার আলী (রহ.) ও অন্যান্য আলেমদের সহযোগিতায় ঢাকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া, লালবাগ প্রতিষ্ঠায় তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন।

যফর আহমদ উসমানী (রহ.) তখন পুরাণঢাকার মৌলভীবাজারে অবস্থান করতেন এবং ইমামগঞ্জ মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। ফজরের পর তিনি ইমামগঞ্জ মসজিদে সহিহ বুখারির দরস দিতেন। এতে শুধু মাদরাসার ছাত্ররাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বিভিন্ন বিভাগের অধ্যাপক এবং দেশের বিশিষ্ট আলেমরাও অংশগ্রহণ করতেন। দেশভাগের আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় গ্রীষ্ম ও শরতের ছুটিতে তিনি ভারতের সুরাট জেলার ডাভেল মাদরাসায় নিয়মিত আমন্ত্রিত হয়ে হাদিসের দরস দিতেন।

তৎকালীন নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ও অল ইন্ডিয়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাধ্যমে তিনি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা অনুষ্ঠানে কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.)-কে করাচিতে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব দেন। ঢাকায় পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব অর্পণ করেন আল্লামা যফর আহমদ উসমানী (রহ.)-এর ওপর। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় আমীরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৫৪ সালে আলিয়া মাদরাসা থেকে অবসর গ্রহণের পর করাচির বিভিন্ন প্রসিদ্ধ মাদরাসা থেকে তাঁকে শায়খুল হাদিস হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু তিনি সব লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সিন্ধুর একটি গ্রামীণ মাদরাসায় শায়খুল হাদিস হিসেবে যোগদান করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, “বড় শহরের আরামদায়ক পরিবেশে কাজ করার লোক অনেক আছে; কিন্তু গ্রামাঞ্চলে গিয়ে কাজ করার লোকের অভাব।” জীবনের শেষ প্রায় বিশ বছর তিনি সেখানেই কাটিয়ে দেন।

তাঁর লিখনীর মধ্যে বহুল পরিচিত একটি কিতাব হচ্ছে ইলাউস সুনান। বিশ খন্ডের এই কিতাবটির পৃষ্ঠা সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। ইলমে ফিকহের তরতীব অনুযায়ী হানাফী ফিকহের মাসায়েলসমূহ যেসব হাদিস থেকে প্রণয়ন করা হয়েছে সেই হাদিসগুলো সুবিন্যস্তভাবে ব্যাখ্যাসহ তিনি একত্রিত করেছেন। তিনি দীর্ঘ বিশ বছর থানভী রহ এর তত্ত্বাবধানে থেকে রচনা তিনি এই মহামূল্যবান গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন।

মিসরের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস যাহেদ কাউসারী এই কিতাব সম্পর্কে বলেন, “এ যুগেও এমন হাদিস বিশারদ দুনিয়াতে আছেন ভেবে অবাক হতে হয়। আমি তাঁর মেধা ও শ্রম দেখে রীতিমত আশ্চর্য হয়েছি। তাঁর সাফল্য সত্যিই ঈর্ষণীয়।”

সমকালীন আরেকজন মুহাদ্দিস আবুল ফাতাহ আবু গুদ্দাহ রহ. ও ইলাউস সুনানের ভূমিকা লিখতে গিয়েও এমন মন্তব্য করেছেন। উল্লেখ্য যে, আবুল ফাতাহ আবু গুদ্দা রহ. কিতাবটির ভূমিকার একটি ব্যাখ্যা লিখে “কাওয়াইদ ফি উলুমিল হাদিস” নামে প্রকাশ করেছেন।
হযরত উসমানী রহ. এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য রচনা হচ্ছে, আহকামুল কুরআন। পবিত্র কুরআনের যেসব আয়াত থেকে শরিয়তের বিধি-বিধান প্রমানিত হয়েছে সেগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বিস্তারিতভাবে নিয়ে এসেছেন তিনি এই কিতাবে। বিশেষত হানাফি ফিকহের কোন মাসায়েল ঠিক কোন আয়াত থেকে প্রণীত সেগুলো দলিলসহ আলোচনার ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে।

আহকামুল কুরআন কিতাবটিও আদ্যোপান্ত থানভী রহ. এর একটি তত্ত্বাবধানে হওয়া একটি বিশাল খেদমত। তিনি মোট চারজন দক্ষ আলেমের মাধ্যমে এই কাজটি আঞ্জাম দিয়েছেন। এর মধ্যে মাওলানা যফর আহমদ উসমানী রহ. এর কাজ ছিল সুরা নিসা পর্যন্ত।

ইলমে ফিকহের মধ্যে তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছ ইমদাদুল আহকাম। এটি সাত খন্ডে সমাপ্ত।
আরও উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘ইনজাউল ওয়াতান’, ‘দালাইলুল কুরআন’ এবং ‘আহাব্বুল জামাল ফি তানযীমিল কামাল’।

১৯৭৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ১৩৯৪ হিজরি ৮২ বছর বয়সে এই মহান আলেম ইন্তেকাল করেন। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের ট্যান্ডো আল্লাহইয়ার (Tando Allahyar) শহরের দারুল উলুম ইসলামিয়া মাদরাসা প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়েছে।

-যাহিদুল ইসলাম

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222