ধর্মীয় শিক্ষায় বিষোদগারসহ নানা বিতর্কে উপদেষ্টা শারমীন; পদত্যাগ দাবি

by hsnalmahmud@gmail.com

হাসান আল মাহমুদ >>

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নারী ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস. মুর্শিদের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ধর্মপ্রাণ মুসলমান, জনতা, আলেম সমাজ এবং ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে তার মন্তব্যকে ‘ইসলামবিদ্বেষী’ ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে এর প্রতিবাদে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত, জাতীয় মুফতী বোর্ডসহ একাধিক ইসলামি দল ও সংস্থা।

বিজ্ঞাপন
banner

বিতর্কের সূত্রপাত

গত ৩ জুলাই, রাজধানীর সচিবালয়ে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শারমীন মুর্শিদ মাদরাসাগুলোতে শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ‘মাদরাসাগুলো চোখের আড়ালে থাকে। তথ্য পাই না। অনেক শিশুই সেখানে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এসব বন্ধে স্কুল-মাদরাসায় মন্ত্রণালয়ের লোকজন যাবে এবং তাদের জবাবদিহি করতে হবে।’

এই বক্তব্যের পর থেকেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছে আলেম সমাজ।

পূর্বের কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনা

শারমীন মুর্শিদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ইসলামি নেতৃবৃন্দ। তারা অভিযোগ করছেন,

তিনি একটি এনজিওপন্থী নারী অধিকার কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয়।

নারী কমিশনের বিতর্কিত রিপোর্ট তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল মুখ্য।

ওই রিপোর্টে ইসলামি ও সামাজিক মূল্যবোধবিরোধী বেশ কিছু প্রস্তাব ছিল—যেমন ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড চালু, ১৮৬০ সালের গর্ভপাত আইন বাতিল, নারীকে সন্তানের একক অভিভাবকত্ব প্রদান, ধর্মনিরপেক্ষ সম্পত্তি বণ্টন, LGBTQ+ অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি।

এছাড়া, তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর ঢাকায় স্থাপনের বিষয়েও বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন। সেই দফতর বিশ্বের অনেক দেশে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও এলজিবিটি এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

ইসলামী নেতাদের কড়া প্রতিক্রিয়া

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা ইউনুস আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মাদরাসা জনসম্পৃক্ত উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠান, যা প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ পরিদর্শন করে। সেখানে এমন কিছু হলে তা গোপন থাকার সুযোগ নেই। একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টার কাজ হলো ব্যবস্থা নেওয়া, অন্ধভাবে অভিযোগ তোলা নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘জনাবা শারমীন মুর্শিদ মাদরাসা বিষয়ে একেবারেই অজ্ঞ এবং তার মন্তব্যে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে। তাকে অবশ্যই ক্ষমা চাইতে হবে।’

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া বলেছেন, ‘উপদেষ্টা শারমীনের বক্তব্য অত্যন্ত ধৃষ্টতাপূর্ণ ও আপত্তিকর। এটি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে। তিনি সেক্যুলার মতাদর্শের অনুসারী এবং ধর্মীয় শিক্ষা বিরোধী চেতনা বহন করেন। এমন ব্যক্তির সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ইসলাম ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। সে সরকারে থেকে কেউ যদি ধর্মীয় শালীনতাবিরোধী বক্তব্য দেন, তা জাতি কখনো মেনে নেবে না।’

হেফাজতে ইসলামের প্রতিক্রিয়া: পদত্যাগ দাবি

এদিকে উপদেষ্টা শারমীনের পদত্যাগ দাবি করেছে উপমহাদশের সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। দলটির যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী ৩৬ নিউজকে বলেন, উপদেষ্টা শারমীন বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেে একজন উপদেষ্টা হিসাবে তার এমন মন্তব্য জাতিকে লজ্জিত করেছে। মাদরাসা শিক্ষার প্রতি বিষোদঘার ও্ কটাক্ষ করে তার শপথ ভঙ্গ করেছেন। উপদেষ্টা পরিষদে তার থাকার সুযোগ নেই। তার পদত্যগ দাবি করছি আমরা।

জাতীয় মুফতী বোর্ড ফাউন্ডেশনের প্রতিক্রিয়া

জাতীয় মুফতী বোর্ড ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাইখুল হাদিস আল্লামা  মুফতি খোরশেদ আলম কাসেমী ৩৬ নিউজকে বলেন, ‘ধর্মীয় শিক্ষা এবং মাদ্রাসা সম্পর্কে নারী ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন মুরশিদের মন্তব্য সরাসরি এ দেশের তৌহিদী জনতার ঈমানি অনুভূতির ওপর আঘাত। তাঁর বক্তব্য ইসলামবিদ্বেষী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’

তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসা হলো এ জাতির রুহানিয়াত ও নৈতিকতার শেষ ভরসাস্থল। যুগ যুগ ধরে মাদ্রাসা জাতিকে নৈতিকতা, সততা ও আদর্শিক চরিত্র গঠনে ভূমিকা রেখে আসছে। সেখানে যৌন নির্যাতনের মতো অপবাদ আরোপ করে উপদেষ্টা শারমীন চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।’

মুফতি খোরশেদ আরও বলেন, “সরকারি পদে থেকে এমন মনোভাব পোষণকারী ব্যক্তি জাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারেন। তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজ করে আসছেন। এখন রাষ্ট্রীয় পদে থেকে সেটি আরও সরাসরি করছেন।”

তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, “এই ধরনের বিতর্কিত ও ইসলামবিরোধী মানসিকতার মানুষ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকার উপযুক্ত নন। অবিলম্বে তাকে উপদেষ্টা পদ থেকে অপসারণ করতে হবে এবং জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। তা না হলে ধর্মপ্রাণ জনতা ঘরে বসে থাকবে না।”

মুফতি কাসেমী সতর্ক করে বলেন, “বাংলাদেশ একটি ঈমানদার জনগোষ্ঠীর দেশ। এখানে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড কখনোই টিকবে না। সরকার যদি সময় থাকতে সঠিক পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এ ক্ষোভ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে—এবং দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।”

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও দাবি

ইসলামি দলগুলো উপদেষ্টা শারমীন মুর্শিদের বক্তব্য ও ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে তার পদত্যাগ বা অপসারণ দাবি করেছে।

অনেকে বলছেন, এই ধরনের মন্তব্য সরকার ও ইসলামপন্থীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কয়েকটি ইসলামি দল এ ইস্যুতে রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা করার কথাও জানিয়েছে।

সরকারের জন্য সতর্কবার্তা

নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি সরকারের পক্ষ থেকে এই উপদেষ্টার বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।

এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সরকারকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা ধর্মবিশ্বাসী জনগণ ও ইসলামী মূল্যবোধের পক্ষে, নাকি ধর্মবিদ্বেষী কিছু উপদেষ্টার এজেন্ডা বাস্তবায়নের সহযোগী হয়ে থাকবে।’

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শারমীন মুর্শিদের বিতর্কিত মন্তব্য একটি স্পর্শকাতর ইস্যুতে রূপ নিয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য শুধুই মাদরাসা ও ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং তা সমাজের বড় একটি অংশকে ক্ষুব্ধ করছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয়—উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ইসলামপন্থীদের আস্থা পুনঃস্থাপন করে, না কি নীরব থেকে আরও সংঘাত ডেকে আনে।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222