জুলাই জাদুঘরে ২০১৩ সালের শাপলাচত্বরের ঘটনাকে স্মরণ করে ভাস্কর্য স্থাপনের সমালোচনা করেছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও সেভ দ্য উম্মাহ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া। তিনি বলেছেন, ভাস্কর্য স্থাপন হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের মূল চেতনা ও ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী।
সোমবার (১৭ আগস্ট) এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ভাস্কর্য নির্মাণের বিষয়টি নিছক শিল্প-সংস্কৃতি, নান্দনিকতা বা স্মারকস্তম্ভের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে ইসলামী আকিদা, শরিয়তের বিধান এবং মুসলিম সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য গভীরভাবে জড়িত।
মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া বলেন, ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন দমন করতে গিয়ে তৎকালীন সরকার শাপলাচত্বরে নৃশংস অভিযান চালায়। সে সময় আহত এক সহপাঠীকে আরেক শিক্ষার্থীর তুলে নেওয়ার হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সম্প্রতি সেই ঐতিহাসিক ও আবেগঘন দৃশ্যকে ভাস্কর্যের রূপ দিয়ে জুলাই জাদুঘরে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে গিয়ে আন্দোলনের মূল চেতনাবিরোধী ভাস্কর্য সংস্কৃতির চর্চা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তিনি বলেন, কুরআন-সুন্নাহয় প্রাণীর ছবি, প্রতিকৃতি ও মূর্তি নির্মাণ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। তাই মূর্তি বা ভাস্কর্য পূজার উদ্দেশ্যে নির্মিত হোক কিংবা কোনো ব্যক্তি, স্মৃতি বা ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক হিসেবে নির্মিত হোক—শরিয়তের বিধান পরিবর্তিত হয় না। মূর্তির নাম পরিবর্তন করে ‘ভাস্কর্য’ বা ‘শিল্পকর্ম’ বললেও মৌলিক বিধান বদলে যায় না।
ইসলামী রাজনীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইসলামী মূল্যবোধ ও বিধিবিধান সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা ইসলামী রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য। তাই রাজনৈতিক স্বার্থে এমন কোনো সংস্কৃতি বা মূল্যবোধ গ্রহণ করা উচিত নয়, যা ইসলামী আকিদা, আদর্শ ও চেতনাবিরোধী।
মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া বলেন, হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চেতনা ছিল রাষ্ট্র ও সমাজে ইসলামী মূল্যবোধের বিস্তার, নাস্তিকতা ও পৌত্তলিক সংস্কৃতির বিরোধিতা, ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, মুসলিম সমাজের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা এবং নবী-রাসুল, উম্মাহাতুল মুমিনিন ও সাহাবায়ে কেরামের সম্মান-মর্যাদা নিশ্চিত করা। সেই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে যদি এমন কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়, যা আন্দোলনের চেতনা ও ইসলামী বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তাহলে তা আন্দোলনের মূল চেতনার সঙ্গে বিদ্রুপের শামিল।
তিনি আরও বলেন, হেফাজতের আত্মপরিচয়, নেতাকর্মীদের ত্যাগ এবং ঐতিহাসিক চেতনা সংরক্ষণে ভাস্কর্যের কোনো প্রয়োজন নেই। শাপলাচত্বরের ইতিহাস সংরক্ষণে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, গবেষণা, গ্রন্থ প্রকাশ, ভাস্কর্যবিহীন শিল্পকর্ম এবং শাপলার শহীদদের নামে জ্ঞান ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাসহ বৈধ ও গ্রহণযোগ্য নানা মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন শাপলাচত্বরের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে ধরনের ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক পরিবেশ রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করাই হবে শাপলাচত্বরের প্রতি যথাযথ সম্মান।
জুলাই জাদুঘরে চেহারা মুছে বা পরিবর্তন করে ভাস্কর্য বহাল রাখার পক্ষের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ইসলামী মূল্যবোধ ও শরিয়াহর কথা যারা বলেন, তাদের নীতি-আদর্শ দলীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়। সাধারণ ভাস্কর্যের বিরোধিতা করে নিজেদের নেতা-কর্মী বা বিশেষ ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে ‘স্মৃতির উদ্দেশ্যে’ কিংবা ‘চেহারা ছাড়া’ ভাস্কর্যকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করলে সমাজে ইসলামের মূল চেতনা সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, অন্যের ভাস্কর্যকে ইসলামবিরোধী বলে সমালোচনা করা, কিন্তু নিজেদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো দ্বিচারিতার শামিল। তাই শাপলাচত্বরের ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণে ইসলামী মূল্যবোধ ও হেফাজতের আন্দোলনের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।
