আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তারপরেই ফুটবল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত মেগা ফাইনাল। যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বজয়ের মহাকাব্যিক লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপিয়ান পরাশক্তি স্পেন। তবে টানা দ্বিতীয়বার সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরতে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে শুধু মাঠের ১১ জন স্প্যানিশ ফুটবলারকে হারালেই চলবে না; একই সঙ্গে লড়াই করতে হবে ইতিহাসের এমন দুটি অতিপ্রাকৃতিক পরিসংখ্যানের বিরুদ্ধে, যা বছরের পর বছর ধরে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের পিছু ছাড়ছে না। এই জোড়া ঐতিহাসিক বাধার কারণেই ফাইনাল ম্যাচটি আলবিসেলেস্তেদের জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
প্রথম অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জটি জড়িয়ে রয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার অফিশিয়াল র্যাংকিংয়ের এক নম্বর অবস্থানের সাথে। আর দ্বিতীয়টি হলো টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব, যা গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে আধুনিক ফুটবলে কোনো দলের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরের ‘অভিশাপ’
চলতি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষস্থানটি আবার পুনরুদ্ধার করেছে। সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে তারা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সকে টপকে এক নম্বরে উঠেছে এবং ফাইনালের প্রতিপক্ষ স্পেনকে নামিয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। আপাতদৃষ্টিতে এটি দারুণ খবর মনে হলেও, এর পেছনে একটি অদ্ভুত ও ভীতিকর ইতিহাস রয়েছে যা আজ পর্যন্ত কোনো দল ভাঙতে পারেনি।
১৯৯৩ সালে ফিফা যখন থেকে অফিশিয়াল বিশ্ব র্যাংকিং প্রথা চালু করে, তখন থেকে আজ পর্যন্ত কোনো দলই টুর্নামেন্ট চলাকালীন বা টুর্নামেন্ট শুরুর প্রাক্কালে র্যাংকিংয়ের এক নম্বরে থেকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তুলতে পারেনি। এই ধারার শুরু হয়েছিল ১৯৯৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে। সেবার জার্মানি শীর্ষ দল হিসেবে টুর্নামেন্টে খেলতে এসেছিল, কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই তাদের বিদায় নিতে হয় এবং চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ব্রাজিল। এরপর থেকে গত ৩২ বছরে কোনো এক নম্বর দলই নিজেদের এই অহংকারী অবস্থানকে শেষ পর্যন্ত ট্রফিতে রূপান্তর করতে পারেনি। আর্জেন্টিনা কি পারবে ১৯৯৪ থেকে চলে আসা এই দীর্ঘ অভিশাপের ইতি টানতে?
৬৪ বছর ধরে অক্ষত ব্যাক-টু-ব্যাক মুকুট ধরে রাখার দেওয়াল
আর্জেন্টিনার সামনে দ্বিতীয় বাধাটি আরও পুরোনো এবং কঠিন। ৬৪ বছরের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতার ব্যাক-টু-ব্যাক রেকর্ড গড়তে চায় আলবিসেলেস্তেরা। ফুটবল সম্রাট পেলের নেতৃত্বাধীন ব্রাজিলের সেই ঐতিহাসিক স্বর্ণালী প্রজন্মের পর আর কোনো দেশ এই কীর্তি অর্জন করতে পারেনি। ব্রাজিলের আগে কেবল ইতালি (১৯৩৪ এবং ১৯৩৮ সালে) এই গৌরব অর্জন করেছিল।
ব্রাজিল ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ এবং ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে টানা ব্যাক-টু-ব্যাক চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তারাই ছিল ফুটবলের ইতিহাসের শেষ দল যারা সফলভাবে নিজেদের বিশ্বমুকুট ধরে রাখতে পেরেছিল। এরপর থেকে গত ৬ দশকেরও বেশি সময়ে যত চ্যাম্পিয়ন দলই তাদের শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নেমেছে, প্রত্যেকেই ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯৮ সালের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ২০০২-এ গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ে, ২০১০-এর চ্যাম্পিয়ন স্পেন ২০১৪-তে এবং ২০১৪-এর চ্যাম্পিয়ন জার্মানি ২০১৮ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে যায়। ফলে বছরের পর বছর ধরে এটি ‘ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নের অভিশাপ’ হিসেবে ফুটবল বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবার ফাইনালে উঠলেও ইতিহাসের এই কালো অধ্যায় তাদের তাড়া করছে।
এক ম্যাচে ইতিহাস ওলটপালটের সুযোগ
রোববারের ফাইনালে স্পেনকে হারাতে পারলে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা যে শুধু আরেকটি বিশ্বকাপ জিতে জার্মানি ও ইতালির সমান ৪টি শিরোপা নিয়ে যৌথভাবে বিশ্ব ফুটবলের দ্বিতীয় সফলতম দল হিসেবে উঠে আসবে তা-ই নয়; একই সঙ্গে আধুনিক বিশ্বকাপের ইতিহাসে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘদিনের দুটি বড় মনস্তাত্ত্বিক অপবাদ ও অভিশাপের চিরতরে অবসান ঘটাবে। এখন দেখার বিষয়, ফুটবল ঈশ্বর মেসির হাত ধরে আলবিসেলেস্তেরা নতুন ইতিহাস লেখে, নাকি স্পেন এই অভিশাপের ধারা বজায় রেখে চতুর্থবারের মতো বিশ্বসেরা হয়।
টিএইচএ/
