আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির ঐতিহ্যবাহী মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বসতে যাচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মেগা ফাইনাল। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় বিশ্বজয়ের চূড়ান্ত মহাকাব্যে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। হাইভোল্টেজ এই ম্যাচের আগে বিশ্বজুড়ে চলছে নানা সমীকরণ ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আলোচনা তৈরি হয়েছে স্পেনের শিরোপা জয়ের এক অতিপ্রাকৃতিক সম্ভাবনাকে ঘিরে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে স্পেনের প্রথমবার বিশ্বজয়ের অভিযানের সঙ্গে চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের অবিশ্বাস্য ও হুবহু ৬টি মিল খুঁজে পেয়েছেন ফুটবল পণ্ডিত ও সমর্থকেরা, যা স্প্যানিশদের দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নকে উসকে দিচ্ছে।
ফুটবলে কুসংস্কার বা ‘পয়া’ (শুভ লক্ষণ) বিষয়টি নতুন নয়। যদিও এসবের পেছনে বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই, এগুলো মাঠের নিখুঁত ফুটবল বা লিওনেল মেসির জাদুকরী মুহূর্ত তৈরি করা আটকাতে পারবে না। তারপরও যুগের পর যুগ ফুটবল সমর্থকদের কাছে এই কাকতালীয় ঘটনাগুলো দারুণ আনন্দের উৎস। নিচে আলোচনা করা হলো সেই ৬টি অতিপ্রাকৃতিক মিল, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে ট্রফি এবার মাদ্রিদেই যাচ্ছে:
১. উদ্বোধনী ম্যাচে একই প্রতিপক্ষ ও একই তারিখ
২০১০ সালের বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল ঠিক ১১ জুন তারিখে। উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকো। অবিশ্বাস্যভাবে, দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয়েছে একই তারিখে অর্থাৎ ১১ জুন এবং প্রতিপক্ষও ছিল হুবহু সেই মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা (শুধু এবার দুই দলের স্বাগতিক ও সফরকারীর অবস্থান বদলেছে)। একই তারিখ ও একই প্রতিপক্ষের এই মিল স্প্যানিশদের জন্য বড় এক শুভ লক্ষণ।
২. আবারও সেই অপয়া গ্রুপ ‘এইচ’
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে স্পেনের ইতিহাস গড়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল গ্রুপ ‘এইচ’ (Group H) থেকে। প্রথা ভেঙে ১৬ বছর পর চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্রয়েও লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল জায়গা পেয়েছে সেই একই গ্রুপে। একই গ্রুপ থেকে যাত্রা শুরু করার এই চক্রটি সমর্থকদের মাঝে প্রচ্ছন্ন আশার জন্ম দিয়েছে।
৩. ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বকাপে আগমন
২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের ঠিক দুই বছর আগে স্পেন জিতেছিল ইউরো ২০০৮-এর শিরোপা। এবারও ঠিক একই মহাজাগতিক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি জিতেই এবার বিশ্বকাপে এসেছে লা রোখারা। অর্থাৎ, দুইবারই স্পেন মাঠে নেমেছে ইউরোপের বর্তমান রাজা হিসেবে।
৪. বিশ্বকাপ বছরেই রিয়ালে মরিনিয়োর আগমন
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও চমকপ্রদ কাকতালীয় মিলগুলোর একটি হলো পর্তুগিজ মাস্টারমাইন্ড হোসে মরিনিয়োকে ঘিরে। ২০১০ বিশ্বকাপের ঠিক আগে রিয়াল মাদ্রিদের প্রধান কোচ হিসেবে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে যোগ দিয়েছিলেন মরিনিয়ো, আর সে বছরই প্রথম বিশ্বকাপ জেতে স্পেন। কাকতালীয়ভাবে, ২০২৬ সালেও ক্লাবের কঠিন সময়ে রিয়াল মাদ্রিদ আবারও মরিনিয়োর ওপর আস্থা রেখে তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে। বিশ্বকাপ বছরে মরিনিয়োর রিয়ালে ফেরা স্পেনের জন্য লাকি চার্ম হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
৫. শেষ ষোলোতে আবারও পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারানো
২০১০ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শেষ ষোলোতে স্পেনের প্রতিপক্ষ ছিল প্রতিবেশী পর্তুগাল। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে ডেভিড ভিয়ার একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল স্পেন। ২০২৬ সালেও শেষ ষোলোর লড়াইয়ে অবিশ্বাস্যভাবে স্পেনের সামনে পড়ে সেই পর্তুগাল। আর ফুটবল ইতিহাসকে স্তম্ভিত করে দিয়ে এবারও ম্যাচের ফলাফল হয়েছে হুবহু এক—পর্তুগালের বিপক্ষে স্পেনের সেই ১-০ গোলের জয়!
৬. আবারও বার্সেলোনাকে ঘিরে স্পেনের শক্তি
২০১০ সালের বিশ্বজয়ী স্পেন দলের মূল চালিকাশক্তি ছিল বার্সেলোনার ব্লক। সেবার দলে বার্সার ঠিক ৮ জন খেলোয়াড় ছিলেন। ১৬ বছর পর ২০২৬ সালের স্পেনের বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও রয়েছেন বার্সেলোনার ঠিক ৮ জন ফুটবলার। তাঁরা হলেন—হোয়ান গার্সিয়া, এরিক গার্সিয়া, পাউ কুবারসি, গাভি, পেদ্রি, দানি ওলমো, ফেরান তোরেস ও বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল। সংখ্যার এই হুবহু মিল ও বার্সেলোনার ফুটবল দর্শনই স্পেনের সাফল্যের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফুটবলে শেষ পর্যন্ত মাঠের ৯০ বা ১২০ মিনিটের পারফরম্যান্সই শেষ কথা বলে। তবে ইতিহাসের এই অভূতপূর্ব মিল ও রোমাঞ্চকর কাকতালীয় ঘটনাগুলো স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্নকে রূপকথার গল্পে রূপ দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি ঘটায় নাকি আর্জেন্টিনা সব পরিসংখ্যান ভেঙে চুরমার করে দেয়।
টিএইচএ/
