মো. রেজওয়ান (রাবি প্রতিনিধি): আর মাত্র তিন মাস পর শেষ হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বর্তমান কমিটির মেয়াদ। দায়িত্ব নেওয়ার আগে দেওয়া ২৪ দফা সংস্কার প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে সেই প্রশ্নই এখন ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের আলোচনা ও পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
গত বছরের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বহুল প্রতীক্ষিত রাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ ২৩টি পদের মধ্যে ভিপি ও এজিএসসহ ২০টি পদে বিপুল জয় পেয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করে। নির্বাচনের আগে জোটটি শিক্ষার্থীদের অধিকার ও ক্যাম্পাস সংস্কারের লক্ষ্যে ২৪ দফা সংবলিত একটি ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। তবে গত নয় মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি অংশে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি এখনো ফাইলবন্দী ও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়ে গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য ও কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থা স্থাপন, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ, ক্যান্টিন ও ডাইনিংয়ের খাবারের মানোন্নয়ন ও মূল্য নির্ধারণে আংশিক পদক্ষেপ, ক্যাম্পাসে প্রয়োজনীয় ফার্মেসি চালু, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সহযোগিতা এবং ক্রীড়াবিষয়ক কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করেছে ছাত্র সংসদ। তবে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ও আকর্ষণের জায়গা—শতভাগ আবাসিকতার রোডম্যাপ, প্রশাসনিক সেবা আধুনিকায়নে অ্যাপ নির্মাণ, অন-ক্যাম্পাস কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ২০ শয্যার উন্নত মেডিকেল সেন্টার স্থাপন, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি প্রতিষ্ঠা এবং ক্যাম্পাসে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করার মতো মেগা প্রতিশ্রুতিগুলোর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
এই ধীরগতি ও প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনের সময় আকাশচুম্বী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রতিনিধিদের একটি বড় অংশ সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে নিজেদের দলীয় রাজনীতি ও এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেশি মনোযোগী হয়েছেন। ফলে ইশতেহারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোকহিতকর উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়েছে। আরেক শিক্ষার্থী সাকিব মল্লিক বলেন, শতভাগ আবাসিকতার রোডম্যাপ ও আবাসিক ভর্তুকির প্রতিশ্রুতি আমাদের সবচেয়ে বেশি আশাবাদী করেছিল। কিন্তু মেয়াদের শেষ দিকে এসেও সে বিষয়ে কার্যকর কোনো ফল পাওয়া যায়নি। লাইব্রেরি সংস্কারের মতো কিছু ইতিবাচক কাজের প্রশংসা করলেও রাকসুর সার্বিক কার্যক্রমে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বর্তমান সংসদের কার্যকারিতা ও সদিচ্ছা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক ও রাকসুর পরাজিত জিএস প্রার্থী নাফিউল ইসলাম জীবন। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, সাধারণ ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানো ও কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখার যে বিশাল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণে বর্তমান রাকসু নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
তবে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর এসব সমালোচনা ও ব্যর্থতার দায় পুরোপুরি মানতে নারাজ রাকসুর শীর্ষ নেতারা। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ছাত্র সংসদের ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ দাবি করেন, তাদের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রায় ৫৯ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে অথবা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বাকি কাজগুলোর জন্যও জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, ফান্ডের তীব্র সংকট এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আশানুরূপ সহযোগিতার অভাব অনেক বড় বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সুর শোনা গেছে রাকসুর এজিএস سلمان সাব্বিরের কণ্ঠেও। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দ্রুত অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় বাজেট সহযোগিতা না পাওয়ায় অনেক জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে মেয়াদের শেষ সময়ে এসেও ধাপে ধাপে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
এখন মেয়াদের বাকি থাকা মাত্র তিন মাসে রাকসু নেতৃত্ব তাদের ইশতেহারের বাকি প্রতিশ্রুতিগুলোর কতটা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটির দিকেই চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
টিএইচএ/
