হাসান আল মাহমুদ >>
বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (OHCHR) একটি মিশন স্থাপন সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের খসড়াকে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সমঝোতা স্মারকের খসড়াকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বৈঠকে ‘নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে কনভেনশন’-এর ঐচ্ছিক প্রটোকলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তও অনুমোদিত হয়। ২০০২ সালে গৃহীত এই প্রটোকলের লক্ষ্য হলো—বিশ্বজুড়ে নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা।
আলেমদের আশঙ্কা কী?
তবে এই সিদ্ধান্তকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও সার্বভৌমত্বের হুমকি হিসেবে দেখছেন আলেম সমাজ। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ একে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঘৃণ্য প্রচেষ্টা বলে উল্লেখ করেছে। সংগঠনটির মতে, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে এ ধরনের কার্যালয় বসানো জাতির আত্মমর্যাদায় আঘাতের শামিল।
এ বিষয়ে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে আগামীকাল শুক্রবার (১১ জুলাই) বাদ জুমা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, ঢাকা মহানগরের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে।
হেফাজতের ঢাকা মহানগরের সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব ও সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মামুনুল হক এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের কার্যালয় স্থাপন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি স্বরূপ। এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঘৃণ্য প্রয়াস।’
তাঁরা আরও বলেন, ‘এ ধরনের কার্যালয় বসানোর মাধ্যমে আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোয় হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা দেশের স্বাধীনতা ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই দলমত নির্বিশেষে সকল দেশপ্রেমিক নাগরিকদের এ কর্মসূচিকে সফল করে তোলার আহ্বান জানাই।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি শায়খুল হাদীস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক এবং মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, বিচার ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সংকটে থাকা অবস্থায় ঢাকায় UNHRC-এর কার্যালয় স্থাপন দেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর বড় হুমকি।
তারা বলেন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ হলো স্বচ্ছ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও জনগণের অংশগ্রহণ, বিদেশি হস্তক্ষেপ নয়। অতএব এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানান তাঁরা।
খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বাংলাদেশে যেসব মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দেশের প্রচলিত আইনে নিশ্চিত করা সম্ভব। এই ক্ষেত্রে প্রয়োজন হচ্ছে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সদিচ্ছা। কিন্তু উক্ত কাজে ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের অনুমোদন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য সঠিক হয়নি। এখানে মানবাধিকার সুরক্ষার দোহাই দিয়ে সমকামিতা ও অবাধ যৌনাচার, মুসলিম পারিবারিক আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দান সহ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কোন অপতৎপরতা দেশপ্রেমিক জনতা কখনো মেনে নিব না। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে নতুন করে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে একজন সমকামী ব্যাক্তিকে নিয়োগ দানে অভিযোগ উঠেছে। যা বাংলাদেশের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক হুমকি।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে কার্যালয় স্থাপনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করছি। অতীতে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘মানবাধিকারের’ নামে ইসলামি শরিয়াহ, পারিবারিক আইন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে হস্তক্ষেপের অপচেষ্টা করেছে। এসব হস্তক্ষেপ একদিকে যেমন জাতীয় সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত, অন্যদিকে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুভূতিরও পরিপন্থী। তাই বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপন এদেশের মেনে নেবে না। অবিলম্বে এ হীন সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসার আহবান করছি।
এদিকে, জাতীয় ইমাম পরিষদ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মুফতি আব্দুল্লাহ ইয়াহইয়া বলেছেন, ‘ঢাকায় জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপনের চেষ্টা শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানীর শামিল।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যাদের নিরাপদ মনে করেছিলাম, তারা আমাদের আশাহত করেছে।’
এর আগেও গত শুক্রবার (৪ জুলাই) জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মালেক জুমার খুতবার আগে এক আলোচনায় বলেন, ‘দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মসজিদের ইমাম ও খতিবদের মতামত নেওয়া হয় না। শুধু পানি পড়া আর দোয়ার জন্য প্রয়োজন পড়লেই আমাদের স্মরণ করা হয়। অথচ জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারের পক্ষ থেকে লালবাগ, চকবাজার, আন্দরকিল্লা বা বায়তুল মোকাররমের কোনো খতিবের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি।’
খতিব আরও বলেন, ‘কুরআন-হাদীসের বিধানকে উপেক্ষা করে জাতিসংঘের নামে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে— এটা বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য চরম লজ্জার বিষয়। আর যিনি এই অফিসের প্রধান হিসেবে আসছেন, তিনি নাকি সমকামী! এটা সরকারের জন্য এবং জাতির জন্য অত্যন্ত অপমানজনক সিদ্ধান্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার একজন বিজ্ঞ আলেমকে ধর্ম উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু এমন স্পর্শকাতর ইস্যুতে ওই উপদেষ্টার কোনো পরামর্শ না নেওয়া হতাশাজনক।’
শেষে সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন দিয়ে বিদায় নিতে চাচ্ছেন— কিন্তু যাওয়ার আগে এমন কাজ করে গেলে জাতি আপনাদের কখনো ক্ষমা করবে না।’
হাআমা/
