মেঘলা আকাশ। জানালার বাইরে প্রকৃতি বিষণ্ণ। অথচ আমাদের মনোজগৎ দখল করে আছে এক গভীর উদ্বেগ—আমরা কি দ্বীনি শিক্ষার প্রাণপুরুষদের গড়ে তোলা সেই মহিমান্বিত ঐতিহ্য হারাতে বসেছি?
জনগণের আমানত, নাকি পারিবারিক সাম্রাজ্য?
জনগণ মাদরাসার জন্য ভূমি দান করেন, নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে তহবিল সমৃদ্ধ করেন। অথচ কোথাও কোথাও দেখা যায়, সেই মাদরাসাকেই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পত্তির মতো পরিচালনা করা হচ্ছে। যোগ্যতা ও আমানতদারির পরিবর্তে আত্মীয়তা ও উত্তরাধিকারকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মেধাবী ও নিবেদিতপ্রাণ আলেমরা উপেক্ষিত হচ্ছেন, আর অযোগ্য বা স্বল্পযোগ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন।
এ প্রবণতা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতাই সৃষ্টি করছে না; বরং মাদরাসার প্রতি মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। জনগণের দান ও ওয়াক্ফের সম্পদ ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা ইসলামী আমানতদারির চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
অন্ধ ‘সাহেবজাদাপ্রীতি’ ভাঙার সময়
পিতৃসুলভ অন্ধ পক্ষপাত এবং বংশগত নেতৃত্বের সংস্কৃতি কওমী মাদরাসাগুলোকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে সাধারণ তালেবে ইলম ও তরুণ আলেমদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে। যেখানে মেধা, তাকওয়া ও যোগ্যতার মূল্যায়ন হওয়ার কথা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক পরিচয়ই প্রধান যোগ্যতায় পরিণত হচ্ছে।
ফলে কিছু মাদরাসাকে দেখে মনে হয়, সেগুলো যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং উত্তরাধিকারভিত্তিক পারিবারিক কাঠামো। এ প্রবণতা কওমী ধারার মৌলিক আদর্শ—ইখলাস, আমানতদারি ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
কিছু জরুরি প্রশ্ন
যদি কোনো সাহেবজাদা প্রকৃত অর্থেই যোগ্য হন, তবে তিনি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিজের মেধা ও নেতৃত্বের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারবেন না কেন?
আর যদি নেতৃত্বের একমাত্র ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক পরিচয়, তবে তথাকথিত গদিনিশীন পীরজাদা সংস্কৃতি এবং কিছু মাদরাসায় গড়ে ওঠা উত্তরাধিকারভিত্তিক নেতৃত্বের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
দেশের বহু ঐতিহ্যবাহী মাদরাসায় নেতৃত্বের এই বংশানুক্রমিক ধারা আজ গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে অনেক অভিজ্ঞ, মুত্তাকী ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে
তবে সব ক্ষেত্রকে এক পাল্লায় মাপা অন্যায় হবে। কোনো মুহতামিম যদি ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ না করে, নিঃস্বার্থভাবে নিজের যোগ্য সন্তানকে মাদরাসার খেদমতে যুক্ত করেন এবং শূরা ও প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার আলোকে দায়িত্ব অর্পণ করেন, তাহলে সেটি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বিষয়।
সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন শূরার মতামত, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মনীতি এবং যোগ্যতার মানদণ্ড উপেক্ষা করে কেবল পারিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে এই প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে।
ঐতিহ্যের ক্ষয় ও শিক্ষার অবনতি
এ ধরনের চর্চার ফলে বহু ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা তাদের পূর্বের প্রভাব, গৌরব ও শিক্ষাগত মান হারাতে বসেছে। বিশাল ভবন, আধুনিক অবকাঠামো কিংবা বিপুল অর্থসংগ্রহ কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উন্নয়নের নিশ্চয়তা নয়। প্রকৃত উন্নয়ন হলো—যোগ্য শিক্ষক, মানসম্মত শিক্ষা, সুস্থ প্রশাসন এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ।
যখন এসব উপাদান দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক সমৃদ্ধি থাকলেও তার আত্মা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এর দায় শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতা ও পূর্বসূরি বুজুর্গদের সুনামকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
চাটুকারিতার সংস্কৃতি
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী ও তোষামোদকারী ব্যক্তি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ব্যক্তিস্বার্থ, পদ-পদবি কিংবা অন্যান্য সুবিধার আশায় তারা যোগ্যতার পরিবর্তে ব্যক্তি-নির্ভর সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করেন।
কওমী মাদরাসাগুলোকে যদি এ ধরনের চাটুকারিতা, স্বজনপ্রীতি ও অযোগ্য নেতৃত্বের প্রভাব থেকে মুক্ত করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে এর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই সময়ের দাবি হলো—স্বচ্ছ প্রশাসন, সুনির্দিষ্ট নিয়োগনীতি, জবাবদিহিমূলক পরিচালনা ব্যবস্থা এবং কার্যকর শূরা-ভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
মেঘলা আকাশ ও আগামীর প্রত্যাশা
জানালার বাইরে আষাঢ়ের মেঘলা আকাশ। মেঘের ভারে প্রকৃতি নীরব। চারপাশে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা। এমন এক সময়ে কওমী মাদরাসাগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মনোযোগ এখনো শিক্ষার মানোন্নয়ন বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চেয়ে নেতৃত্বের উত্তরাধিকার নির্ধারণে বেশি ব্যস্ত। অথচ সময়ের দাবি ছিল ভিন্ন।
তবুও আমি আশাবাদী
তবুও আমি আশাবাদী। আমি বিশ্বাস করি, এই কালো মেঘের আড়ালেই রয়েছে এক উজ্জ্বল ভোরের সূর্য। দ্বীনি শিক্ষার এই পবিত্র দুর্গগুলোকে রক্ষা করতে সময়ের সচেতন তারুণ্য, মেধাবী আলেম, দূরদর্শী শিক্ষানুরাগী এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব অবশ্যই এগিয়ে আসবে। তারা মেধা, যোগ্যতা, তাকওয়া ও আমানতদারির ভিত্তিতে নতুন এক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবে।
আমি এমন এক কওমী অঙ্গনের স্বপ্ন দেখি, যেখানে ব্যক্তিপূজা নয়, মূল্যায়িত হবে যোগ্যতা; বংশমর্যাদা নয়, সম্মানিত হবে ইলম ও তাকওয়া; গদিনিশীন হওয়ার মোহ নয়, প্রাধান্য পাবে খেদমত ও আমানতদারি।
সেই কওমীর আঙিনায় অবিরাম প্রবাহিত হবে ওহীর ইলমের স্বচ্ছ, নির্মল ও পবিত্র ঝর্ণাধারা। আর ইলমপিপাসু আলেম ও শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে পান করবে হিদায়াতের সুপেয় আবেহায়াত।
লেখক : পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ
