হাসান আল মাহমুদ >>
গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর পূর্বঘোষিত ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিতে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী ছাত্রলীগ-যুবলীগের বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় বইছে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সন্ত্রাসী হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, মঞ্চ পুড়িয়ে দেওয়া, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং নেতাকর্মীদের অবরুদ্ধ করে রাখার ন্যাক্কারজনক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছে দেশের শীর্ষ ইসলামী দলসমূহ। তাঁরা দোষীদের গ্রেফতার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং অবরুদ্ধ নেতৃবৃন্দকে দ্রুত উদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন। ঘটনাটিকে প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা এবং দেশে পুনরায় ফ্যাসিবাদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অশনি সংকেত বলে মনে করছেন তারা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
নাহিদ-সার্জিস-হাসনাতসহ অবরুদ্ধ নেতৃবৃন্দকে দ্রুত উদ্ধারে জরুরী পদক্ষেপ নিন। গোপালগঞ্জে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রধান নেতৃত্বের ওপরে হামলায় অংশ নেয়া স্বৈরাচারের দালালদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম, পীর সাহেব চরমোনাই আজ ১৬ জুলাই এক বিবৃতিতে বলেছেন, গোপালগঞ্জ বাংলাদেশের সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিনে থাকা একটি জেলা। সারা বাংলাদেশ যখন একযোগে স্বৈরাচারী হাসিনাকে উৎখাত করেছে তখন গোপালগঞ্জে হাজার হাজার খুন, গুম ও হাজার কোটি টাকা পাচারকারী শক্তির পক্ষে কেউ প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে দেশপ্রেমিক ছাত্র নেতৃত্বের ওপরে হামলা করবে এবং তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখবে তা মেনে নেয়া যায় না। দ্রুততার সাথে অবরুদ্ধ নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাদের উদ্ধার করতে জরুরী পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক সংগঠন এনসিপি জুলাই জুড়ে দেশব্যাপী পদযাত্রা করছে। সর্বত্র তারা জনগনের উষ্ণ অভিনন্দন ও ভালোবাসা পাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজকে তারা গোপালগঞ্জে গিয়েছে। তাদের সাথে আজকে গোপালগঞ্জে যা হয়েছে তা লজ্জাজনক। একই সাথে প্রশাসনের ব্যর্থতাও বটে। অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দ গোপালগঞ্জে আসলে সেখানে পতিত ফ্যাসিবাদের দোসররা বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে এটা তাদের অনুধাবন করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিলো। কিন্তু আজকের ঘটনায় পরিস্কার যে, প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। গোপালগঞ্জের পুলিস সুপারসহ দায়িত্বে নিয়োজিতদের ব্যাপারে তদন্ত করতে হবে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সহিংসতার সুযোগ করে দিলো কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে।
পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, কোন কোন মিডিয়া হামলাকারী ফ্যাসিবাদের দোসরদের “গ্রামবাসী, এলাকাবাসী”অভিহিত করেছে। এর পেছনের কারণ সুস্পষ্ট। তারা বিশ্বকে বোঝাতে চায় যে, হাসিনার উৎখাতের আন্দোলন কোন গণঅভ্যুত্থান ছিলো না। গ্রামবাসী এখনো হাসিনার জন্য রাস্তায় নামে। আদতে পুরোটা মিথ্যা বয়ান। যারা এনসিপির ওপরে হামলা করেছে তারা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী। এদেরকে আওয়ামী লীগের পান্ডা হিসেবেই প্রচার করতে হবে। এবং যারা যারা এই হামলার সাথে জড়িত ছিলো তাদেরকে অবিলম্বে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ফ্যাসিবাদের পক্ষ হয়ে এখনো কেউ জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দের ওপরে হামলা করবে তা মেনে নেয়া যায় না।
পীর সাহেব চরমোনাই সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, অভ্যুত্থানের বর্ষপুর্তির এই সময়েও স্বৈরাচারের দোসররা যে দুঃসাহস দেখিয়েছে তা সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতার বড় একটি দৃষ্টান্ত। পতিত ফ্যাসিবাদের বিচার এবং এর সাথে জড়িতদের বিচারের ধীরগতির কারণেই এরা আজকে এই সাহস করেছে। তাই বলবো, কেবল ঢাকায় গুটিকয়েকজনকে বিচারের আওতায় আনলে হবে না বরং সারা দেশে স্বৈরতন্ত্রের সাথে জড়িত সকলকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনুন। এই ধরণের দুঃসাহস জাতী আর দেখতে চায় না।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ আজ এক বিবৃতিতে বলেন, গোপালগঞ্জে এনসিপি আয়োজিত পূর্বঘোষিত ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিতে সন্ত্রাসী হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ ও পুলিশের ওপর আক্রমণের ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক, নিন্দনীয় ও গণতন্ত্রবিরোধী। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে এধরনের সহিংস হামলা রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি।
তিনি বলেন, দেশ এক গভীর রাজনৈতিক সংকট অতিক্রম করছে। জনগণ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে যাওয়ার জন্য সংগ্রামরত। এমন সময় একটি ভারতপন্থী গোষ্ঠী পলাতক নেত্রীর ইন্ধনে দেশে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। আজকের হামলা তারই অংশবিশেষ।
মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, যারা এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত, তারা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও দেশের সার্বভৌমত্বের শত্রু। অতীতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও তাদের মদদপুষ্ট দোষীদের পরিচয় সকলের জানা। এসব হামলাকারীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এই ঘটনায় পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। আমরা তাদের আশু সুস্থতা কামনা করি। পাশাপাশি, এ ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে—দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটছে। সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনে করে, দেশের জানমাল, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সকল অশুভ ও ষড়যন্ত্রমূলক শক্তিকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। বিশেষ করে পলাতক দুর্নীতিবাজ নেত্রী ও তার দেশবিরোধী সহযোগীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
মহাসচিব দেশপ্রেমিক সকল রাজনৈতিক শক্তি, নাগরিক সমাজ ও ইসলামপ্রিয় জনতাকে বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
ইসলামী ঐক্যজোট (আইওজে):
আজ ১৬ জুলাই বুধবার এক বিবৃতিতে ইসলামী ঐক্যজোট (আইওজে)-এর মহাসচিব মুফতী সাখাওয়াত হোসাইন রাজী বলেন, গোপালগঞ্জ জেলায় এনসিপির পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে পতিত ফ্যাসিবাদের দোসররাই হামলা চালিয়েছে। এই হামলা গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর সরাসরি আঘাত। আমরা এই ন্যাক্কারজনক সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানাই এবং অতিদ্রুত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টামূলক শাস্তির দাবি জানাই।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীন দেশের প্রতিটি ইঞ্চিতে ‘আমাদের অধিকার’, তাহলে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধা কেন? এই ঘটনার দায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এড়াতে পারে না। হামলাস্থলে তাদের কার্যকর তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিবৃতিতে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের দমন-পীড়ন করে এনসিপি বা ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিতে দমিয়ে রাখা যাবে না। সরকারকে গোপালগঞ্জসহ বাংলাদেশের সর্বত্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি
আজ এক বিবৃতিতে পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার বলেন, “ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর দুস্কৃতিকারিরা আবারো দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিসহ নৈরাজ্যের মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। আজ গোপালগঞ্জে এনসিপি’র পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির ওপর বর্বরোচিত হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, ইউএনও সহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশ সদস্যদের আহত করার বর্বর ঘটনা সেই অপতৎপরতারই বহিঃপ্রকাশ। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারণে আওয়ামী দোসররা মরণকামড় দিয়ে ইন্টেরিম গভর্নমেন্টকে বেকায়দায় ফেলে ফায়দা লুটতে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য এখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এসব দুস্কৃতিকারিদের কঠোর হস্তে দমন ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ দেশে যাতে আবারও ফ্যাসিবাদের উত্থান হতে না পারে সেজন্য দেশের মানুষের জানমাল রক্ষায় দল, মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এর ব্যতয় হলে দেশ আবারও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় হুমকির মুখে পড়বে।”
খেলাফত মজলিস
আজ এক যুক্ত বিবৃতিতে খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির শান্তিপূর্ণ সমাবেশে আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীদের হামলা ও ভাঙচুর বর্বরতার শামিল। উক্ত হামলায় এনসিপির নেতৃবৃন্দ সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আহত হন। পুলিশের গাড়ী পুড়িয়ে ফেলা হয়, গাছ কেটে রাস্তা অবরোধ করা হয়। আমরা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।
গণঅভ্যুত্থানে পরাজিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির সুযোগে আবারো সংগঠিত হতে শুরু করেছে। এদেরকে ছাড় দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। প্রশাসনকে এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। হামলাকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এই ফ্যাসিবাদী অপশক্তি যাতে দেশের জানমালের আর ক্ষতি করতে না পারে সরকারকে সতর্ক হতে হবে। খেলাফত মজলিস সহ দেশপ্রেমিক জনতা এনসিপির পাশে আছে, ফ্যাসিস্ট খুনীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আছে।
ইসলামিক বুদ্ধিজীবী ফ্রন্ট
ইসলামিক বুদ্ধিজীবী ফ্রন্টের আহবায়ক শাহসূফী ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ আবদুল হান্নান আল হাদী গোপালগঞ্জে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ফ্যাসিবাদের দোসরদের প্রকাশ্যে হামলা ও মঞ্চ জ্বালিয়ে দেয়ার মত ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ সরাসরি হামলায় জড়িত হলো কীভাবে? প্রশাসন এর দায়ভার নিতে হবে এবং অবরুদ্ধ নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাদের উদ্ধার করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, গোপালগঞ্জের ঘটনায় আমরা চরম উদ্বিগ্ন ও ব্যথিত। জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক সংগঠন এনসিপি জুলাই জুড়ে দেশব্যাপী পদযাত্রা করছে। সর্বত্র তারা জনগণের উষ্ণ অভিনন্দন ও ভালোবাসা পাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজকে তারা গোপালগঞ্জে গিয়েছে। তাদের সাথে আজকে গোপালগঞ্জে যা হয়েছে তা লজ্জাজনক। একইসাথে প্রশাসনের ব্যর্থতাও বটে। প্রশাসনে এখনও ফ্যাসিবাদ আওয়ামী দোসররা সক্রিয়।
শাহসূফী ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ আবদুল হান্নান আল হাদী বলেন, ফ্যাসিবাদের বিচার কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় এবং সংস্কার প্রলম্বিত হওয়ায় ফ্যাসিবাদরা শক্তি সঞ্চয় করছে দেশের জনগণের বিরুদ্ধে। অবিলম্বে গোপালগঞ্জের সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেইসাথে ফ্যাসিবাদকে আশ্রয় প্রশ্রয় দাতাদেরকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
হাআমা/
