আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ >>
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ‘সেফ এক্সিট’ (নিরাপদ প্রস্থান) ইস্যু। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকার ঘিরে এই বিতর্ক শুরু হয় এবং পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পড়ে সচিবালয় থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত।
সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, “কিছু উপদেষ্টা নিজেদের সেফ এক্সিট খুঁজছেন। অনেকে গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, কেউ কেউ নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। সময় হলে আমরা তাদের নাম প্রকাশ করব।”
তার এই মন্তব্যে উপদেষ্টাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার ঝড় ওঠে। কেউ কেউ সরাসরি নাহিদ ইসলামকে তার বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ দিতে বলেন, আবার কেউ একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মন্তব্য হিসেবে আখ্যা দেন।
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, “বর্তমানে অনেকেই সেফ এক্সিটের কথা বলছেন। আমি বলতে চাই, উপদেষ্টা হিসেবে আমাদের সেফ এক্সিটের প্রয়োজন নেই। বরং এখনকার ভয়াবহ রাষ্ট্রকাঠামো থেকে এই জাতির সেফ এক্সিট হওয়া দরকার।”
শনিবার রাজধানীর এক হোটেলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ–২০২৫–এর পরামর্শ সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, “আমরা নিজেরা সেফ এক্সিট চাই না, স্বাভাবিক এক্সিট চাই। দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ঘরে ফিরে যাব, বিদেশে পালিয়ে নয়—কারণ আমার দ্বিতীয় কোনো ঘর নেই।”
শনিবার রাঙামাটির জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ওলামা পরিষদ আয়োজিত সম্প্রীতি সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনের প্রস্তুতি শতভাগ সম্পন্ন। কোনো শঙ্কা থাকলে নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা সমাধান করবে।”
অন্যদিকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বলেন, “উপদেষ্টাদের সেফ এক্সিটের প্রয়োজন নেই। একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে তারা দায়িত্ব নিয়েছেন এবং সেই দায়িত্ব পালন করছেন।”
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে লেখেন, “যাদের একাধিক দেশের পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব রয়েছে, তারাই এখন অন্যদের সেফ এক্সিটের তালিকা করছে। আমরা এ দেশেই জন্মেছি, এ দেশেই মরব ইনশাআল্লাহ।”
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “কে সেফ এক্সিট নিতে চায়, তা নাহিদ ইসলামকেই পরিষ্কার করতে হবে। আমি দেশের সংকটের সময় কখনো পালিয়ে যাইনি, ভবিষ্যতেও যাব না।”
সেফ এক্সিট কী?
সাধারণভাবে ‘সেফ এক্সিট’ বলতে বোঝায় নিরাপদে কোনো স্থান বা অবস্থান ত্যাগ করা। তবে রাজনীতিতে এর অর্থ আরও গভীর—কোনো সংকটময় বা দায়বদ্ধ পরিস্থিতি থেকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে জবাবদিহিতার বাইরে রেখে নিরাপদে প্রস্থানের সুযোগ করে দেওয়া।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ ধারণাটি নতুন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৭৫, ২০০৯ এবং ২০২৪ সালে ক্ষমতার পালাবদলের সময় অন্তত তিনবার ‘সেফ এক্সিট’-এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, চলমান ‘সেফ এক্সিট’ বিতর্ক মূলত আসন্ন নির্বাচনের আগে অবস্থান শক্ত করা, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক কৌশলেরই বহিঃপ্রকাশ। আর নাহিদ ইসলাম যেহেতু নিজেও এই সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, তাই তার বক্তব্যকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ গুরুত্বেই দেখা হচ্ছে।
হাআমা/
