হাসান আল মাহমুদ >>
গাজীপুরে হিন্দু যুবক কর্তৃক ১৩ বছর বয়সী এক মাদরাসা ছাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনায় সারাদেশে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজ ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছে।
পুলিশ ইতোমধ্যে প্রধান অভিযুক্ত জয় কুমার দাসকে গ্রেফতার করেছে। তবে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভিক্টিমের পরিবার ও সহমর্মী সংগঠনগুলো।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) গাজীপুর জজকোর্ট প্রাঙ্গণে এক মানববন্ধনে ভিক্টিমের পক্ষে মাওলানা আতাউর রহমান বিক্রমপুরী অভিযোগ করে বলেন, ‘আশামনিকে পুলিশ চাপ দিয়েছে যেন সে বলে— আমি স্বেচ্ছায় পালিয়েছি ও ফিরে এসেছি। অথচ সে তিনদিন ধরে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, ‘ফরেনসিক পরীক্ষার নামে আশামনিকে ছয় দিন কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছিল, যা ছিল মানসিক নির্যাতনেরই অংশ।’
জানা যায়, ভুক্তভোগী কিশোরীর নাম আশামনি (১৩)। তার গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামে। বাবা-মা গাজীপুরের মৌচাকে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। অভিযোগ অনুযায়ী, দুই মাস আগে প্রতিবেশী জয় কুমার দাস তার শ্যালক লোকনাথ চন্দ্র দাস ও সঞ্জিত বর্মনের সহযোগিতায় মেয়েটিকে অপহরণ করে লোকনাথের ভাড়া বাসায় নিয়ে যায় এবং জোরপূর্বক তিনদিন ধরে ধর্ষণ করে। পরে মেয়েটির কান্নাজড়িত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ
ঘটনার পর গাজীপুরসহ সারাদেশে ন্যায়বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
গাজীপুর সচেতন নাগরিক ইউনিটি নামের একটি সংগঠন পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে—
- পুলিশের মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিবৃতি প্রত্যাহার ও ক্ষমা প্রার্থনা,
- ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড,
- মাওলানা আতাউর রহমান বিক্রমপুরীর প্রতি হুমকি প্রদানকারী পংকজ পালকে গ্রেফতার,
- ধর্মবিদ্বেষী সংগঠন ইস্কন নিষিদ্ধকরণ,
- মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করে একজন সৎ কর্মকর্তার নিয়োগ।
এদিকে ঘটনাটির প্রতিবাদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। ‘আমার বোন ধর্ষিতা কেন? ইন্টেরিম জবাব দে’, ‘ধর্ষকের ফাঁসি চাই’, ‘ধর্ষকের ঠিকানা এই বাংলায় হবে না’— এসব স্লোগানে ক্যাম্পাস প্রকম্পিত হয়।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের মুখ্য সংগঠক ফেরদৌস শেখ বলেন, “ধর্ষণ শুধু অপরাধ নয়, এটি মানবতার প্রতি এক নির্মম আঘাত। অপরাধীর একমাত্র শাস্তি কঠোরতম বিচার।”
ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি একেএম রাকিব বলেন, “ইন্টেরিম সরকারের আমলে চার শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এখনো কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। তাই জনগণ প্রশ্ন করছে— এই সরকার ধর্ষকের না কি জনতার?”
ইসলামী ছাত্র শিবিরের জবি শাখা সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “মাদরাসা শিক্ষার্থীরা ধর্ষণের শিকার হলে সুশীল সমাজ নীরব থাকে। আমরা এর কঠোর জবাব চাই।”
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও প্রতিবাদ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী ছাত্রী সংস্থা ‘কালিয়াকৈরের শিশু ধর্ষণ ও ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতনের’ প্রতিবাদে মানববন্ধন করে। সংগঠনের নেত্রী ফাতেমাতুস সানিহা বলেন, “এই দশ মাসে চার হাজারের বেশি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, কিন্তু বিচার খুব কম। আমরা এমন শাস্তি চাই যেন পরবর্তীবার কেউ এ ধরনের ঘৃণ্য কাজ করতে ভয় পায়।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, “ভিক্টিমকে প্রেমের সম্পর্কের ট্যাগ দিয়ে ধর্ষণ আড়াল করা হচ্ছে। সরকার নারীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।”
ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখাও শুক্রবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম থেকে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। সংগঠনের নেতারা বলেন, ‘গাজীপুরের এই নৃশংস ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত ফাঁসির দণ্ড কার্যকর না করা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’
হাআমা/
