আমানুল্লাহ নাবিল মামদুহ >>
জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের প্রশ্নে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি—এবার মুখোমুখি অবস্থানে। তবে উভয় দলই গণভোট আয়োজনের পক্ষে একমত। মূল বিতর্ক—গণভোট কবে হবে, জাতীয় নির্বাচনের দিনেই নাকি তার আগে আলাদাভাবে।
ঐকমত্য কমিশনের সর্বশেষ সুপারিশে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোটের আয়োজন করা উচিত। কিন্তু সেই সময়সূচি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তৈরি হয়েছে দৃশ্যমান মতভেদ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের বলেন—
“গণভোটের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান একদম স্পষ্ট—জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হতে হবে। এর বাইরে কোনো আলোচনা বা আপসের সুযোগ নেই।”
তিনি আরও বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর করতেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প নেই।”
আমীর খসরু দাবি করেন, নির্বাচন ও গণভোট আলাদা দিনে হলে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়বে। “একই কাঠামোর অধীনে একই দিনে দুটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়,” বলেন তিনি।
বিএনপি নেতার ভাষায়, “তারেক রহমান খুব শিগগিরই দেশে ফিরবেন, ইনশাআল্লাহ”—এ মন্তব্যের মাধ্যমেও তিনি দলের আত্মবিশ্বাসের বার্তা দেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামি চায় জাতীয় নির্বাচনের আগে, আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যেই গণভোট অনুষ্ঠিত হোক।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার-এর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেয় জামায়াতের সাত সদস্যের প্রতিনিধি দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, “জুলাই সনদে যে সংস্কারগুলো নিয়ে ঐকমত্য হয়েছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরা জরুরি। জনগণ জানতে পারুক তারা কী পরিবর্তন চায়। তাই নভেম্বরই গণভোটের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।”
তিনি যুক্তি দেন, “একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট হলে কেন্দ্রভিত্তিক সহিংসতা বা ভোট বন্ধের ঘটনা ঘটতে পারে। তখন গণভোটের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
জামায়াতের পক্ষ থেকে বৈঠকে ১৮ দফা সুপারিশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, প্রবাসীদের ভোটের সুযোগ তৈরি, নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই এবং নির্বাচনী আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা।
বিএনপির আপত্তি প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, “আরপিও সংশোধনীর বিষয়ে বিএনপির আপত্তি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ভঙ্গের জ্বলন্ত উদাহরণ। আমরা কমিশনকে বলেছি, সংশোধিত বিধান বহাল রেখেই নির্বাচন হতে হবে।”
যা বলল ঐকমত্য কমিশন
এদিন দুপুরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি প্রফেসর ড. আলী রিয়াজ জানান,
“গণভোট আয়োজনের আদেশ সরকারের পক্ষ থেকেই দেওয়া হবে। আমরা কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নির্ধারণ করিনি। সরকার আদেশ জারির পর থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত যেকোনো সময় গণভোট হতে পারে।”
তিনি বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আমরা বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিয়েছি—কোন সুপারিশ অধ্যাদেশের মাধ্যমে, আর কোনটি আদেশের (অর্ডার) মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে, তা পরিষ্কারভাবে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে।”
ড. আলী রিয়াজ আরও জানান, ৬টি সংস্কার কমিশনের ১৬৬টি সুপারিশ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠিয়ে ৩০টি দলের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের মতামত, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং কমিশনের সদস্যদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই চূড়ান্ত সুপারিশ প্রস্তুত করা হয়েছে।
এর আগে সকালে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা সম্পর্কিত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে ঐকমত্য কমিশন।
হাআমা/
