আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ >>
দেশে আবারও আলোচনায় এসেছে ‘গণভোট’। ইংরেজি ‘রেফারেন্ডাম’-এর বাংলা প্রতিশব্দ গণভোট—যার মাধ্যমে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে। এটি সাধারণত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেমন সংবিধান সংশোধন, নতুন আইন প্রণয়ন বা বাতিল, কিংবা শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে জনগণের অভিমত জানতে আয়োজিত হয়।
ব্যালটে সাধারণত দুটি বিকল্প দেওয়া হয়—‘হ্যাঁ’ ও ‘না’। নাগরিকেরা ভোটের মাধ্যমে জানান, তাঁরা প্রস্তাবিত সিদ্ধান্তের পক্ষে নাকি বিপক্ষে। জাতিসংঘের সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, সংবিধান গ্রহণ বা সংশোধনের জন্য আয়োজিত গণভোটই বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে প্রচলিত ধরন।
১৯৮০-এর দশকের শেষে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি সংবিধানে গণভোটের বিধান যুক্ত ছিল। জাতিসংঘের ‘রেফারেন্ডাম ইন কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক রূপান্তর ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের ধারায় গণভোট ব্যবহারের হার তখন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশে গণভোটের সূচনা ও ইতিহাস
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রথম গণভোট হয় ১৯৭৭ সালে। এরপর ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে আরও দুটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত দেশে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে—দুটি প্রশাসনিক এবং একটি সাংবিধানিক ইস্যুতে।
প্রথম গণভোট (১৯৭৭):
রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময় দেশে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। উদ্দেশ্য ছিল তাঁর শাসনকার্যের বৈধতা দেওয়া এবং নীতি ও কর্মসূচির প্রতি জনগণের আস্থা যাচাই।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৮৪ লাখ, যার মধ্যে ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পড়ে। ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ১ দশমিক ১ শতাংশ। দৈনিক বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ভোট ছিল “জিয়ার প্রতি জাতির আস্থা জ্ঞাপন।”
দ্বিতীয় গণভোট (১৯৮৫):
দ্বিতীয় গণভোট হয় রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে, ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। এতে প্রশ্ন ছিল—“রাষ্ট্রপতি এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির প্রতি জনগণের আস্থা আছে কি না।”
ভোট পড়েছিল ৭২ দশমিক ২ শতাংশ, যার মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
তৃতীয় গণভোট (১৯৯১):
গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর, ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় গণভোট। বিষয় ছিল—রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রূপান্তর। এতে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ, আর ‘না’ ভোট ছিল ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ।
এই ভোটের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়।
গণভোটের আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিধান যুক্ত হয় দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে, যা পরে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টের এক রায়ে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করা হয়।
১৯৯১ সালের গণভোটের আগে যে আইন করা হয়েছিল, তার প্রস্তাবনায় বলা হয়—সংবিধানের নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিল গৃহীত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন দেবেন কি না, তা যাচাইয়ের জন্য গণভোট আয়োজনের বিধান রাখা হয়েছে।
কেন আবার আলোচনায় গণভোট?
জুলাই মাসের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিলে গণভোট নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব দিলে ইসলামি দলগুলো তা দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানায়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিসসহ আটটি দল সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে যৌথ স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। তাদের দাবি—নভেম্বর মাসের মধ্যেই জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট আয়োজন করতে হবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, ‘গণভোট ছাড়া জাতীয় সনদ আইনি টেকসইতা পাবে না।” ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও একই দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে এবং বলেছে, “গণভোটই জনগণের আস্থার একমাত্র পথ।’
এদিকে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে মিছিল শুরু হয়। এরপর পুরানা পল্টনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা করেছেন জামায়াতসহ আন্দোলনরত ৮টি দলের নেতা-কর্মীরা। সেখানে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি জমা দেওয়া হবে।

আজ বৃহস্পতিবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি দল রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দলগুলো হলো জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলাপমেন্ট পার্টি।
অন্যদিকে, বিএনপি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন অযৌক্তিক ও অবিবেচনাপ্রসূত। এখন জাতির অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সুষ্ঠু নির্বাচন।’
হাআমা/
