আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ >>
ঢাকা–১৪ আসনে বিএনপির মনোনীত এমপি প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি সম্প্রতি পুরুষের চারটি বিবাহের শরয়ি অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘একজন পুরুষের ক্ষেত্রে চারটা বিবাহ করা যাবে, এই এখতিয়ার কি আমাদের বোনরা দিয়েছে কাউকে? এই সমাজ আমরা চাই না। সমাজব্যবস্থায় এদেরকে জায়গা আমরা দিতে চাই না।’
তার এই বক্তব্যকে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করে নমিনেশন বাতিল ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশের দাবি: নমিনেশন বাতিল ও বিচার
দাওয়াতি ও মানবিক সংগঠন ‘পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশ’ এক বিবৃতিতে বলেন, সানজিদা তুলির বক্তব্য কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিধানের বিরুদ্ধে অবমাননাকর। সংগঠনের আমির ড. মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকী বলেন—
‘ইসলামি শরীয়তের বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। কোনো ব্যক্তি বা দল এটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অধিকার রাখে না। কুরআনের হুকুম নিয়ে কটূক্তি স্পষ্ট ইসলামবিদ্বেষ এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরির প্রচেষ্টা।’
তিনি আরও দাবি করেন —‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানায় সানজিদা তুলির নমিনেশন অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে এবং তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে শরীয়তকে অবমাননার সুযোগ দেওয়া হবে না।’
সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে তুলির বক্তব্যকে “ইসলাম বিদ্বেষী”, “ধর্মীয় অজ্ঞতা” ও “দ্বিচারিতা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শায়খ মুহিউদ্দীন ফারুকী লিখেন, সানজিদা আক্তার তুলির ইসলাম বিরোধী বক্তব্যের জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। এ বিষয়ে আলেমদের কথা বলা উচিত। এমপি না হতেই এই অবস্থা!
বিশিষ্ট অনুবাদক ও লেখক আবদুল্লাহ আল ফারুক লিখেন, সানজিদা হক তুলি। ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। তার ভাই, বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনকে ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বনানী থেকে গুম করা হয়। তারপর থেকে অদ্যাবধি তার কোনো খোঁজ মিলেনি।। ভাই হারানোর সেই শোক থেকে তিনি ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের মাধ্যমে গুমের শিকার অন্যান্য পরিবারের পাশে দাঁড়ান এবং এই বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার সেই সামাজিক আন্দোলন থেকে মুগ্ধ হয়ে বিএনপি তাকে ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, তিনি সম্প্রতি পুরুষদের চার বিয়ের অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞের ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন। সমস্যা হলো, তুলির মতো লোকগুলো ধর্মীয় লাইনে নিতান্তই অজ্ঞ। প্রাথমিক পড়াশুনাটুকুও নেই। এজন্যে মাঝে মাঝে নিরেট মূর্খতা থেকে ইসলামের এমন সব বিধান সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে, যা সরাসরি কুরআন থেকে প্রমাণিত অকাট্য বিধান।
তিনি বলেন, আমরা সানজিদা হক তুলিকে আহবান করব, তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে নিজের অজ্ঞতার স্বীকারোক্তি দিয়ে প্রদত্ত বক্তব্য সম্পর্কে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। একদিকে ‘মদিনার ইসলাম চাই’ বক্তব্য দেবেন, আর অন্যদিকে কুরআনের অকাট্য বিধানের ওপর প্রশ্ন তুলবেন, এমন দ্বিচারিতা বাদ দেন।
তিনি আরও বলেন, ইসলাম সম্পর্কে মনগড়া বক্তব্য বিএনপি-জাশির যেই তুলবে, আমরা তার বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ জানাব। আমরা কাউকে ধর্ম নিয়ে বাণিজ্য করতে দেব না।মনে রাখবেন, দেশের সংবিধান থেকেও আল্লাহর কুরআন অধিক পবিত্র ও সর্বজন মান্য। সংবিধান আজ আছে, কাল নেই। সাংসদরা যখন ইচ্ছা তার ওপর কলম চালাতে পারে। কিন্তু কুরআন কারিম চৌদ্দশো বছর ধরে অক্ষুন্ন। তার ওপর প্রশ্ন তোলার অধিকার শুধু তুলি কেন, তাকে মনোনয়ন দানকারী তারেক রহমানেরও নেই।
কথা পরিষ্কার।
রোকন রাইয়ান লিখেন, মনোনয়ন পেয়েই শুরু করে দিলো ইসলাম বিদ্বেষ। এমপি হলে কী করবে একবার চিন্তা করুন…
প্রকাশক আবুল কালম আজাদ বলেন, এই আসনে ভোট কাকে দেওয়া উচিত, এটা নিয়ে এতদিন হয়তো সাধারণ জনগণ দোটানায় ছিল। কারণ, একজন নিজে গুমের শিকার। আরেকজনের ভাই গুম আছেন এখনো। হয়তো আর বেঁচে নেই। তো আজকে মিস তুলি সেটা স্পষ্ট করে দিলেন যে, মুসলমানদের ভোট তার দরকার নেই। আচ্ছা, তুলির এই বক্তব্য নিয়ে শীর্ষ আলিমদের কী মত? তাঁরা কোনো ফাতওয়া দেবেন?
তিনি আরও বলেন, ‘অবিলম্বে তার এই আপত্তিকর ও ধর্মবিরোধী বক্তব্য প্রত্যাহার করে মুসলমানদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এরকম বক্তব্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উত্তেজিত করবে। সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করবে। যারা এরকম মুখরোচক মুখস্থ কিছু কথাবার্তা বলে, মূলত ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা বা কম জানার কারণে কিংবা ভুল জানার কারণে। তাদের উচিত ইসলাম নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা না করলেও সাধারণ বিষয়গুলো সম্পর্কে পড়াশোনা করা।’
বিতর্ক থামছেই না, মিলছে না বিএনপির কেন্দ্রীয় বক্তব্য
বিবৃতি, সমালোচনা ও বয়ান—সব মিলিয়ে বিতর্ক আরও বেড়েই চলেছে। বিএনপি এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি। ধর্মীয় সংগঠনগুলো নমিনেশন বাতিলের দাবিতে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
হাআমা/
