কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের দাবি তীব্রতর

by hsnalmahmud@gmail.com

হাসান আল মাহমুদ >>

ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মুসল্লির সমাবেশে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়ত মহাসম্মেলন। খতমে নবুয়ত সংরক্ষণ কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ মহাসম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের আমীর, দেশের শীর্ষ আলেম আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর। পাকিস্তান, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত আলেম ও স্কলারদের অংশগ্রহণে সম্মেলনটি রূপ নেয় এক ঐতিহাসিক মিলনমেলায়।

বিজ্ঞাপন
banner

সম্মেলনে বক্তারা এক কণ্ঠে ঘোষণা দেন—মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ–এর পরে আর কোনো নবী নেই, এ আকিদা সুরক্ষা করা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। বক্তারা কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার জোরালো দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এ বিষয়ে কোনো সমঝোতার সুযোগ নেই।

হেফাজতে ইসলামের আমির: ‘বাংলাদেশেও কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা জরুরি’

হেফাজতে ইসলামের আমির মহিবুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও বহু মুসলিম রাষ্ট্র ইতোমধ্যে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করেছে। মুসলমানদের ঈমান রক্ষায় বাংলাদেশেও একই সিদ্ধান্ত নেওয়া অপরিহার্য।
তিনি বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফার অন্যতম দফা হচ্ছে—কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা। কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করার বিষয়ে সরকারের প্রতি আমরা দৃঢ় দাবি জানাচ্ছি। এ দাবির কোনো বিকল্প আমরা চাই না। খতমে নবুয়তের আকিদার ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়।’

তিনি ইসলামি জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে সরকারের প্রতি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানান।

মাওলানা ফজলুর রহমান: ‘খতমে নবুয়ত উম্মাহর সম্মিলিত ইস্যু, কোনো দেশের সীমাবদ্ধ বিষয় নয়’

পাকিস্তান উলামায়ে জমিয়তের সভাপতি মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, নবুয়ত সমাপ্তির আকিদা সমগ্র উম্মাহর যৌথ বিষয়।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে উম্মাহর ঐক্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ–পাকিস্তানের মুসলমান এক আকিদা, এক শক্তিতে আবদ্ধ।”

তিনি যোগ করেন, তাহরীক-এ-তাহাফ্ফুযে খতমে নবুওয়ত কোনো বিভেদ নয়; বরং উম্মাহর ঐক্য ও আকিদা রক্ষার আন্দোলন। পাকিস্তানের ওলামায়ে কেরাম এখানে শুধু উপস্থিতি জানাতে আসেননি—বরং তারা একটি পয়গাম নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য। আর এখান থেকে আমি পয়গাম নিয়ে যেতে চাই পাকিস্তানের মুসলমানদের কাছে।

মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মুসলমান—দুই দেশের হলেও এক আকিদা, এক শক্তি। আজকের এই খতমে নবুয়ত মহাসমাবেশ দুই দেশের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সম্পর্ক ও সহযোগিতার বন্ধন আরও শক্তিশালী করবে। মোহাব্বতের এই সম্পর্ক ইনশাআল্লাহ আরও গভীর হবে।

আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব: ‘নবীর পরে কোনো নবী নেই—বিষয়টি চূড়ান্ত, এতে আপস নেই’

সম্মিলিত খতমে নবুওয়াত পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুল হামিদ পীর সাহেব বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আলেমদের উপস্থিতি খতমে নবুয়তের আকিদাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘নবীর পরে কোনো নবী নেই; হেদায়াতের বিপরীতে কোনো নতুন পথ নেই; আর বাতিলের সাথে কোনো আপস নেই।’

তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে বলেন, ক্ষমতায় এলে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে—অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধেও আন্দোলন হবে।

বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক: ‘কাদিয়ানী ৭২ ফেরকারও নয়, ইসলামের বাহিরে’

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক দবলেছেন, কাদিয়ানী সম্প্রদায় ইসলামের গণ্ডির ভেতর ৭২ ফেরকারও নয়, বরং তারা ইসলামের গণ্ডির বাহিরে। তাদের এ পরিচয়েই চলতে হবে। রাষ্ট্রকে সে ঘোষণাই দিতে হবে।

খতিব বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঈমানী বিষয়কে কেন্দ্র করে আজ সবাই একত্রিত হয়েছেন। কিছু মানুষ এই বিষয়েও অস্পষ্টতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে, কেউ কেউ নিজেই ধোঁকার মধ্যে পড়ে অন্যদের ধোঁকা দিচ্ছে।

তিনি বলেন, এটিকে কিছু লোক ‘মাজহাবের ইখতেলাফ’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়— যা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। “কাদিয়ানী তো মাজহাবের ভিন্নতা নয়; তারা ইসলামের গণ্ডির বাইরের একটি দল। অতএব এটাকে মাজহাব বা ফিরকার ইখতেলাফ বলা যাবে না। বিষয়টিতে স্পষ্ট থাকতে হবে।”

তিনি বলেন, দেশে অনেক অমুসলিম আছে এবং তারা তাদের পরিচয় নিয়ে বাস করছে, কিন্তু কাদিয়ানীরা এ দেশে থাকলেও মুসলিম পরিচয়ে থাকতে পারবে না। “প্রশাসন এ কথা বোঝে না— এমন নয়। তাদের করণীয় হলো ইসলামের পরিচয় রক্ষা করা এবং এ বিষয়ে নিজেদের ঈমানি অবস্থান সুস্পষ্ট করা।”

মুফতি মালেক আরও বলেন, “সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো কোনো ধোঁকার আশ্রয় না নেওয়া এবং ইসলামের সঠিক অবস্থান জনগণের সামনে তুলে ধরা।” পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে কাদিয়ানীদের পণ্য ও ব্যবসা বয়কট করা উচিত।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আলেম-ওলামাদের এ বিষয়ে বসিরাতের (আলোচনা-সমালোচনা) মাধ্যমে, গবেষণাভিত্তিকভাবে স্পষ্ট বক্তব্য জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে।

কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করতে হলে আলেমদের সংসদে যেতে হবে: মাওলানা ইলিয়াস ঘুম্মান

মুতাকাল্লিমে ইসলাম, তরজুমানে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস গুম্মান (পাকিস্তান) বলেছেন, ‘কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করতে হলে আলেমদের সংসদে যেতে হবে।’

সাইয়েদ কাফিল বুখারী: ‘কাদিয়ানী ফেতনা শুধু স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ’

সৈয়দ আতাউল্লাহ শাহ বুখারীর নাতি, প্রসিদ্ধ আলেম সাইয়েদ কাফিল বুখারী বলেন, ‘মহানবী ﷺ সর্বশেষ নবী—এ বিশ্বাসই ইসলামের ভিত্তি। কাদিয়ানী ফেতনা পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশসহ পুরা অঞ্চলে ব্যাপক আলোচনার বিষয়।’

তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ কাদিয়ানী মতবাদের বিপক্ষে সমন্বিত অবস্থানে রয়েছে।

মাওলানা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী : ‘সংবিধানে মুসলমানদের দাবি প্রতিফলিত না হলে সেই সংবিধান মানা হবে না’

তাহরীকে খতমে নবুওয়তের আমির মুফতি ড. সাইয়্যেদ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী বলেন, নবুওয়তের দরজা চিরতরে বন্ধ—এটাই ইসলামের চূড়ান্ত শিক্ষা।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সেক্যুলার রাজনীতির নামে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয় না। অথচ দেশের প্রকৃত মালিক মুসলমানরা। তাদের দাবি সংবিধানে প্রতিফলিত না হলে সেই সংবিধান মানা হবে না।’

মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ: “আর ফতোয়া নয়—এবার রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত চাই’

দেশের শীর্ষ মুফতি আল্লামা মিজানুর রাহমান সাঈদ বলেন, ‘কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা বিশ্বব্যাপী হয়েছে। এখন করণীয়—বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা নিশ্চিত করা।’

তিনি আরও বলেন, যদি সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না করে, তাহলে ঈমানদার যুবকরা প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত।

সালাহউদ্দিন আহমদ (বিএনপি): ‘সংসদে গেলে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি পূরণ করব’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা-বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে আপনাদের সব ঈমানি দাবি আমরা সংসদে তুলব।’

তিনি নবুওয়তের চূড়ান্তত্ব স্পষ্ট করে যোগ করেন—“যারা রাসূল ﷺ–এর পক্ষে নয়, তারা মুসলমান হতে পারে না।”

জামায়াতের রফিকুল ইসলাম খান: ‘রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে’

বাংলাদেশ জামাতে ইসলামের সহকারী সেক্রেটারি জনাব রফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা বিষয়ে মুসলিম বিশ্বে কোথাও কোনো দ্বিমত নেই। জামায়াত ক্ষমতায় এলে এ ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, “রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু হাদীসে ঘোষণা দিয়েছেন— তিনিই শেষ নবী, তার পরে আর কোনো নবী আসবে না। এই আকিদা ইসলামি উম্মাহর সর্বসম্মত বিশ্বাস।’

জমিয়তের মহাসচিব আফেন্দী: ‘ধর্মীয় প্রতীক ও আচার মুসলমানদের জন্যই সংরক্ষিত’

জমিয়তের মহাসচিব মনজুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, ‘নামাজ, আজান, মসজিদসহ মুসলিম প্রতীক কোনো অমুসলিমের ব্যবহার করা উচিত নয়। কাদিয়ানীদের বিষয়ে অস্পষ্টতা রাখার সুযোগ নেই।’

জুনায়েদ আল হাবিব: “বাংলাদেশে তারা থাকবে—কিন্তু মুসলমান পরিচয়ে নয়”

হেফাজত নেতা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, ‘কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করতে হলে আমরা কাফনের কাপড় পরে রাজপথে নামতে প্রস্তুত।’

তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহরণ তুলে ধরেন এবং বলেন—সকল ধর্মের মানুষ এখানে নিরাপদে বসবাস করে।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222