আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ >>
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাতিল হওয়া নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবারও সংবিধানে ফিরে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই বহুল আলোচিত ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন।
সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্যান্য সদস্য ছিলেন—বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস. এম. ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ. কে. এম. আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ, বাতিল রায় অসাংবিধানিক
রায়ে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পূর্বের রায় “একাধিক ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ” এবং “সম্পূর্ণরূপে অসাংবিধানিক”। ফলে তা বাতিল করা হলো। একইসঙ্গে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করে সংবিধানে পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যকর করা হলো।
আপিল বিভাগ আরও জানিয়েছে, সংবিধানের চতুর্থ ভাগের পরিচ্ছদ-২(ক)-এর অধীনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে বিধান ছিল, তা আজকের রায়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত ও পুনর্বহাল হলো। তবে বিধানটি শুধুমাত্র ভবিষ্যৎ প্রয়োগের জন্য কার্যকর হবে।
এর আগে ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক বাতিল রায়ের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) শুনানি শেষে আপিল বিভাগ পূর্ণাঙ্গ আপিল শুনানির অনুমতি দেয়। আজ সেই আবেদনের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হলো।
রাজনৈতিক দলগুলোর স্বস্তি ও প্রতিক্রিয়া
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো স্বস্তি প্রকাশ করেছে। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ায় বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে আনন্দ ও স্বস্তির ছাপ দেখা যাচ্ছে।
বিএনপি
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। আজকের রায় দেশের গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের বড় মাইলফলক। আগামীর নির্বাচন সুসংহত, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে ইনশাআল্লাহ।”
তিনি আরও বলেন, ‘একটি নির্বাচিত সরকারের পক্ষে যেসব কাজ করা সম্ভব হয়, কোনো অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে তা সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশের মানুষ একটি নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।”
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম
সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন মন্তব্য করেন, ‘আজকের দিনটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য ঈদের দিন। সর্বসম্মতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার কারণেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এলো।”
জামায়াতে ইসলামী
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘যে রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল, সেটি বিতর্কিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। আজকের এই রায়ের মাধ্যমে গণতন্ত্র তার ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসবে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ হয়, সেজন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করি।”
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
দলটির মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমাদ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে ১৪ বছর আগের দেয়া রায় বাতিলের যে আদেশ দেয়া হয়েছে তা সাংবিধানিক অরাজকতার বিরুদ্ধে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই রায়ের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের যে চমৎকার পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তা আবারো আইনগত মর্যাদায় পুনর্বহাল হলো। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই রায়কে স্বাগত জানাচ্ছে।
অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমাদ বলেন, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদ আদালতের ওপরে বন্দুক রেখে দেশে সাংবিধানিক ও আইনী অরাজকতা প্রতিষ্ঠা করেছিলো। আইন-আদালতের যথেচ্ছা ব্যবহারের এমন নোংরা ও বিধ্বংশী ব্যবহার আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিরল। কিন্তু ফ্যাসিবাদ তার বহুমাত্রিক অপশক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আজকের রায় এর এক ধরণের প্রতিকার হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদে যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা হ্যা ভোটে জয়যুক্ত হলে আগামীর বাংলাদেশে আর কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে ছিনিমিনি করতে পারবে না। এই ব্যবস্থা আগামীর বাংলাদেশে ক্ষমতা হস্তান্তরে একটি শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা নির্মাণ করবে ইনশাআল্লাহ।
খেলাফত মজলিস
সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ কর্তৃক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের ঐতিহাসিক রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে খেলাফত মজলিস। আজ এক যুক্ত বিবৃতিতে খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, ‘বিগত ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাতিল ঘোষণা করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর প্রেক্ষিতে দলীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত ৩টি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একদলীয় আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসন প্রলম্বিত হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ভিন্নমতের বিরুদ্ধে শুরু হয় নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন। বিগত ১৬ বছর গণহত্যা, গুম, অপহরণ, নির্যাতন, নিপীড়নের স্টিমরোলার চালিয়ে বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জননিরাপত্তা হুমকীর সম্মুখীন করে ফেলা হয়।’
তারা আরও বলেন, ‘আজকে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের পক্ষে যে রায় দিয়েছেন তাতে দেশবাসী আনন্দিত। এতে জনগণের বিজয় অর্জিত হয়েছে। আজকের দিনটি ঐতিহাসিক। এই রায় চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর হবে। বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনকালীন সন্ত্রাস-সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছাড়া এই মুহূর্তে বিকল্প পথ নেই। আমরা উচ্চ আদালত সহ এই রায়ের পক্ষে যারা কাজ করেছেন সকলকে মোবারকবাদ জানাই।’
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর আল্লামা সরওয়ার কামাল আজিজিও মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার এক যৌথ বিবৃতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনে দেওয়া রায়কে ঐতিহাসিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।
নেতৃবৃন্দ বলেন, জনগণের ভোটাধিকার ও নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছিল রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এই ব্যবস্থাকে পুনরায় চালু করার রায় জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং সুশাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এক সাহসী পদক্ষেপ।
তাঁরা আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জনগণ নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশায় ছিল। এ রায়ের মাধ্যমে সেই প্রত্যাশার দিগন্ত উন্মোচিত হলো। আমরা সরকারের এই অবস্থানকে সাধুবাদ জানাই এবং আশা করি—এটি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করা হবে।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি মনে করে, সকল রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি গড়ে তুলবে, যেন ভবিষ্যতের নির্বাচন স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়।”
অ্যাটর্নি জেনারেলের মন্তব্য
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করে যে নির্বাচন হয়েছিল, তাতে দেশের গণতন্ত্রের কবর রচিত হয়েছিল। আজকের রায়ের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ আগামী দিনে নিজের ভোট নিজে দিতে পারবে। এটি গণতান্ত্রিক মহাসড়কে চলার শুরু।”
তিনি আরও বলেন, ‘ত্রুটিপূর্ণ বলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়টি আজ বাতিল করা হয়েছে।”
হাআমা/
