৩২ ঘণ্টায় চারবার ভূমিকম্প! কীসের ইঙ্গিত? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

by hsnalmahmud@gmail.com

আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ >>

ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় মাত্র সাড়ে ৩২ ঘণ্টায় চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে পরপর দুটি ভূমিকম্প হয়, যেগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার বাড্ডা এলাকা। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দুই সেকেন্ড ব্যবধানে হওয়া এই দুই কম্পনের মাত্রা ছিল যথাক্রমে রিখটার স্কেলে ৩.৭ এবং ৪.৩।

বিজ্ঞাপন
banner

আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির জানান, সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট ৪ সেকেন্ডে প্রথম ভূমিকম্প এবং ৬টা ৬ মিনিট ৫ সেকেন্ডে দ্বিতীয় কম্পন রেকর্ড করা হয়।

এর আগে একই দিনে সকাল ১০টা ৩৬ মিনিট ১২ সেকেন্ডে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় ৩.৩ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এরও আগে, শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে হওয়া ভূমিকম্পটি সারা দেশজুড়ে অনুভূত হয়। ভয়াবহ সেই কম্পনে শিশুসহ ১০ জন নিহত এবং ছয় শতাধিক আহত হন। নরসিংদীতে পাঁচজন, ঢাকায় চারজন এবং নারায়ণগঞ্জে একজনের মৃত্যু হয়। আতঙ্কে ভবন থেকে লাফ, ভবন হেলে পড়া ও ফাটল ধরা—এসব ঘটনাও ঘটে।

তাহলে কি এগুলো বড় ভূমিকম্পের আগাম বার্তা?

গত সাড়ে ৩১ ঘণ্টায় চারটি ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করেছে। তারা বলছেন, ছোট ও মাঝারি মাত্রার ধারাবাহিক ভূমিকম্প বড় ধরনের ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থানগত ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাজধানী ঢাকা। কারণ—

  • অধিকাংশ ভবনই বিল্ডিং কোড মেনে নির্মিত নয়
  • নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল
  • গ্যাস-বিদ্যুতের অপরিকল্পিত লাইন বিপর্যয়ের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়

সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, গত বছরের শেষ দিক থেকে চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশের আশপাশে ৫০টির বেশি ভূমিকম্প হয়েছে। গত ১৫ বছরে ছোট-বড় ১৫০টির বেশি কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিলেট-চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল, ভারতের মনিপুর-মিজোরাম এবং মিয়ানমারের পার্বত্য অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।

কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চল থেকে মেঘনা–বঙ্গোপসাগর–আন্দামান পর্যন্ত যে কাল্পনিক রেখাটি ধরা যায়, তা দুটি টেকটোনিক প্লেট—ভারতীয় প্লেট ও মিয়ানমার প্লেটের সংযোগস্থল। এই অঞ্চলটি বহু বছর ধরে লকড অবস্থায় আছে। গত শত বছরে এখানে বড় ভূমিকম্প হয়নি, ফলে বিশাল পরিমাণ শক্তি জমে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পও হতে পারে।

কেন সবচেয়ে ঝুঁকিতে ঢাকা?

বিজ্ঞানীদের সতর্কতা অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প যদি ঢাকার আশপাশে কেন্দ্র নিয়ে ঘটে, তবে—

  • প্রায় দুই লাখ ভবন ধসে পড়তে পারে
  • দু–তিন লাখ মানুষ হতাহত হতে পারে
  • রাজধানীর ৩৫% ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে

একই স্থানে বারবার কম্পন হলে সামনে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী

অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ বলেন, ‘ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। একই স্থানে বারবার কম্পন হলে বুঝতে হবে সামনে বড় আসছে। সে বিষয়ে অপেক্ষা করতে হবে আরও চার-পাঁচদিন। তারপর বোঝা যাবে কী হয়।’

বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী জানান, ঢাকার সব ভবনের তাৎক্ষণিক পরীক্ষা জরুরি। সরকার চাইলে রাজউকের মাধ্যমে ভবনগুলো পরীক্ষা করে কোনটি বিল্ডিং কোড মেনে নির্মিত, তা সনদ দিতে পারে—এতে সরকারের অতিরিক্ত কোনো ব্যয়ও হবে না।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, শুক্রবারের ভূমিকম্প ছিল ঢাকা অঞ্চলে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। এর আগে দেশের বাইরে উৎপত্তিস্থল থেকে ৪–৫ মাত্রার কম্পন অনুভূত হলেও ঢাকার এত কাছে এমন শক্তিশালী ভূমিকম্প দেখা যায়নি।

ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ইন্দো–বার্মা টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে হওয়া এই সাম্প্রতিক ভূমিকম্প শক্তির ‘আটকে থাকা’ অবস্থা থেকে মুক্তির শুরু নির্দেশ করছে। সামনে নতুন ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

ভূমিকম্প বিষয়ে আলেমদের অভিমত

ভূমিকম্প নিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই এক মহাকম্পন মহাপ্রলয়ে রূপ নেবে একদিন। সেদিন সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। নিশ্চয় কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার (সুরা হজ: ১)

তিনি বলেন, ভূমিকম্পের মাত্রা আরেকটু বেশি হলেই হয়তো আমাদের অনেকের জীবনের শেষ দিন হতো আজ। আজকে ভূমিকম্প অনেক বড় সতর্কবার্তা রেখে গেল আমাদের জন্য। আসুন, বিলম্ব না করে আল্লাহর দিকে সমর্পিত হই। তাওবা করি। প্রস্তুত হই।”

ড. মিজানুর রহমান আজহারী বলেন, ‘ভেবে দেখেছেন কি? আজ ভূমিকম্পের তীব্রতা আরো ভয়াবহ হলে খুব কম সংখ্যক মানুষের শেষ আমল হতো ফজরের নামাজ। সেই লিস্টে আপনি থাকতেন তো? উত্তর ‘না’ হলে শুধরে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এখনো। এই কম্পনে টের না পেলেও চূড়ান্ত কম্পন কিন্তু ঠিকই টের পাইয়ে দিবে। তাই আসুন, সময় থাকতে নিজেদের শুধরে নিই।

তোমরা কি নিশ্চিত হয়ে গেছো যে, যিনি আসমানে রয়েছেন তিনি তোমাদেরকেসহ এ জমিনকে ধ্বসিয়ে দেবেন না, অতঃপর আকস্মিকভাবে তা থর থর করে কাঁপতে থাকবে? (সুরা মুলক: ১৬)”

জাতীয় ইমাম পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা গাউসিয়া মার্কেট জামে মসজিদের খতীব মুফতী আবদুল্লাহ ইয়াহ্ইয়া বলেন, ভূমিকম্প আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন, যা মানুষকে তাঁর ক্ষমতা ও মহিমার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ভূমিকম্প এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আল্লাহ তা’আলা মানুষের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে পাঠিয়ে থাকেন, যেন মানুষ পাপচার থেকে ফিরে আসে। এটি মানুষের জুলুম অন্যায় ও পাপের পরিণাম হতে পারে। সুরা বনি ইসরাইলের ৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন: আমি ভয় প্রদর্শনের জন্যই এসব নিদর্শন প্রেরণ করি।

তিনি আরো বলেন, জামে’ তিরমিযীর ২২১২ নং হাদীসে রাসুল ﷺ বলেন: যখন গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্র বিস্তৃতি লাভ করবে এবং মদপানের সয়লাব ঘটবে তখন ভূমিকম্প/ভূমিধস, চেহারা বিকৃতি ও পাথর বর্ষণের মত আযাব এই উম্মাতের মাঝে ঘনিয়ে আসবে। হযরত থানবী রহ. বলেন, ভূমিকম্পের কারণ পাপ এবং এর দ্বারা উদ্দেশ্য বান্দাদেরকে সতর্ক করা ও তওবার প্রতি ধাবিত করা।

তিনি দেশের সর্বসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই সময়ে আমাদের করণীয় হলো তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা এই ধরনের দুর্যোগের সময় দ্রুত আল্লাহর কাছে তাওবা করা উচিত এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়া ও বেশি বেশি আল্লাহর নাম স্মরণ করা এবং তাঁর কাছে নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য দোয়া করা উচিত। আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা মুমিনের কর্তব্য।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222