হাসান আল মাহমুদ >>
আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় খোস্ত প্রদেশে জনসম্মুখে কিসাস কার্যকরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা বাড়লেও স্থানীয় আফগান জনগণ উল্টো তাদের ধুয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি—১৩ জনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত মঙ্গলের বিরুদ্ধে শরিয়াভিত্তিক এই শাস্তিই ন্যায়বিচারের প্রকৃত রূপ, এবং এতে সমালোচনার কোনো ভিত্তি নেই।
এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহল সমালোচনা করলেও আফগানিস্তানের ভেতরে উল্লেখযোগ্য অংশ এই রায়কে শরিয়া আইনের ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবে সমর্থন করছে।
স্টেডিয়ামে জনসমক্ষে শাস্তি কার্যকর
ইমারাতে ইসলামিয়ার সুপ্রিম কোর্ট জানায়, মঙ্গলের বিরুদ্ধে রায় তিন ধাপ—নিম্ন আদালত, আপিল বিভাগ এবং সুপ্রিম কোর্ট—সকল স্তরেই বহাল থাকে। পরে তালেবান আমির হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কিসাস কার্যকরের চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।
কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে শাস্তি প্রত্যক্ষ করার আহ্বান জানায়। কিসাসের শাস্তি বাস্তবায়নকে তারা ইসলামী ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অংশ বলে উল্লেখ করেছে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর এটি ছিল অন্তত ১২তম জনসম্মুখে মৃত্যুদণ্ড।
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের ক্ষমা করার বিকল্প দেওয়া হয়; কিন্তু তারা কিসাস—“চোখের বদলে চোখ”—নীতি বেছে নেয়।
আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দা, ‘অমানবিক’ বলছে জাতিসংঘ
জাতিসংঘের আফগানিস্তানবিষয়ক মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদক রিচার্ড বেনেট শাস্তি কার্যকরের আগে এটি বন্ধের আহ্বান জানান। তিনি এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন।
কিছু মানবাধিকার সংগঠন এ ধরনের পাবলিক এক্সিকিউশনকে “নিষ্ঠুর” ও “ভয়ভীতিপূর্ণ” বলে বর্ণনা করেছে।
স্থানীয়দের পাল্টা প্রতিক্রিয়া: ‘ন্যায়বিচারই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে’
তবে খোস্তসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। তাদের অনেকেই বলছেন, নারকীয় হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধে কিসাস কার্যকর হওয়া উচিত ছিল এবং এতে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে।
খোস্তের বাসিন্দা জবিউল্লাহ বলেন, ‘নির্দোষ নারী-শিশু নিহত হলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো নীরব থাকে। কিন্তু ১৩ জনকে হত্যাকারী একজনের বিরুদ্ধে শরিয়া অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া মাত্রই তাদের আপত্তি—এটা দ্বিচারিতা।’
আরেক বাসিন্দা হালিম মোহাম্মদ বলেন, ‘আল্লাহর আইন কার্যকর হলে তারা বিরোধিতা করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।’
স্থানীয়দের মতে, শরিয়াভিত্তিক কঠোর শাস্তি কার্যকর হলে চুরি, হত্যা, অপহরণের মতো অপরাধ কমে যাবে এবং অপরাধীরা ভয় পাবে।
জমালউদ্দিন বলেন, ‘চোর–ডাকাতদের হাত কেটে শাস্তি দিলে অন্যরা শিক্ষা নেবে। সমাজ নিরাপদ হবে।’
গুরবুজে বিমান হামলায় ১০ জন নিহত—‘আন্তর্জাতিক নীরবতা কেন?’
এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে, কারণ মাত্র নয় দিন আগে খোস্তের গুরবুজ জেলায় পাকিস্তানের বিমান হামলায় একটি পরিবারের নয় শিশু ও এক নারী নিহত হন।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতা তাদের আস্থা নষ্ট করেছে।
বাংলাদেশেও প্রতিক্রিয়া
আফগানিস্তানে জনসম্মুখে কিসাস কার্যকর বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নেটিজেনরা বলছেন,
ফেসবুক ব্যবহারকারী মেহেদী হাসান লিখেন, ‘আফগানরা স্টেডিয়ামে বিচার করছে বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। অথচ গাজায় গণহত্যা নিয়ে একই মহলের তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। মানবাধিকারের নামে দ্বৈত আচরণ চলছে।’
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ‘বাংলাদেশে দুর্নীতিবাজ বা বড় অপরাধীদের এভাবে জনসম্মুখে শাস্তি হলে মানুষ কীভাবে দেখত?’
রোকেয়া আক্তার মন্তব্য করেছেন, ‘যেখানে জনগণ নিরাপত্তা চাইছে, সেখানে কঠোর শাস্তি অপরাধীদের সতর্ক করে। আফগান জনগণের দৃঢ় অবস্থান প্রশংসনীয়।’
সাদিকুর রহমান লিখেছেন, ‘শরিয়া আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার কার্যকর হলে অপরাধ প্রবণতা কমে। আফগানরা সঠিক পথে এগোচ্ছে।’
ফারজানা মিলি মন্তব্য করেছেন, ‘অপরাধীদের জনসম্মুখে শাস্তি প্রদর্শন সমাজে সতর্কতা সৃষ্টি করে। আফগান জনতা ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দিচ্ছে, এটা সম্মানযোগ্য।’
আদিল হোসেন লিখেছেন, ‘কিসাস কার্যকর হওয়ার ফলে ভুক্তভোগী পরিবার এবং সমাজে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন দেখা যায়। এটি আইন ও নিরাপত্তার বাস্তব উদাহরণ।’
ইমারাতে ইসলামিয়ার অবস্থান
তালেবান প্রশাসন বলছে, ‘কিসাস ইসলামী শরিয়ার অংশ। উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়, বরং অপরাধ দমন, ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সমাজে নিরাপত্তাবোধ বাড়ানো।’
তাদের দাবি, আফগান জনমতের বড় অংশ শরিয়াভিত্তিক ন্যায়বিচারকে সমর্থন করে।
প্রতিবেদনটিতে আফগানি জনগণের মতামত টোলোনিউজের সূত্রে
হাআমা/
