শরিকদের বঞ্চনা, মনোনয়ন বিতরণে ফাটল; বিএনপি কি ভুল পথে?

by hsnalmahmud@gmail.com

হাসান আল মাহমুদ >>

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে শরিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও আসন বণ্টন প্রশ্নে বিএনপি নজিরবিহীন চাপে পড়েছে। দুই দফায় মোট ২৭২টি আসনে এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা করায় ক্ষোভ, বঞ্চনা ও আস্থাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে। শরিক দলগুলো অভিযোগ করছে—বিএনপি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, এবং বহু বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে অংশীদার দলগুলোকে ‘বেঈমানি’র শিকার করেছে। তবে, জমিয়তসহ কয়েকটি শরিক দল এখনো আশা ছাড়েনি। দলগুলো বলছে, বিএনপি তাদের আশাহত করবে না।

বিজ্ঞাপন
banner

দুই দফায় ২৭২ আসনে মনোনয়ন, জোটে বিস্ময় ও হতাশা

প্রথম দফায় ২৩৭টি এবং দ্বিতীয় দফায় আরও ৩৬টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি। এতে মোট ২৭২টি আসনে দলের একক প্রার্থী দাঁড়িয়ে যায়। এরপরই শরিকদের মধ্যে প্রশ্ন—বাকি ২৮টি আসন কি শরিকদের জন্য রাখা হচ্ছে, নাকি বিএনপি এককভাবে নির্বাচন করতে যাচ্ছে?

কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না দেওয়ায় শরিক দলগুলো মনে করছে—‌‌বিএনপি মাঠ দখল করে ফেলতে চায় এবং শরিকদের প্রয়োজনীয় মনে করছে না।’

কারা বঞ্চিত হলেন? কোন কোন আসনে ক্ষোভ?

১. জাতীয় দল – কিশোরগঞ্জ-৫ (অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা)

১৫ মাস টানা মাঠে থাকার পরও বিএনপি সেখানে নিজ প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালকে মনোনয়ন দেয়।
জাতীয় দলের অভিযোগ—‘তারেক রহমানের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি।’

২. এনপিপি – নড়াইল-২ (ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ)

ধানের শীষে ২০১৮ সালেও নির্বাচন করেছিলেন। এবারও আশায় ছিলেন। কিন্তু বিএনপি নিজ প্রার্থী মনিরুল ইসলামীকে দেয় মনোনয়ন।
এনপিপির বক্তব্য—‌দুর্দিনে পাশে থেকেও সুদিনে বঞ্চিত হলাম।’’

৩. বাংলাদেশ লেবার পার্টি – ঝালকাঠি-১ (ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান)

বিএনপির সঙ্গে দুই দশকের পথচলা, যুগপৎ আন্দোলন, গ্রেফতার, হামলায় নিহত কর্মী—সবই ইতিহাস। কিন্তু তবুও মনোনয়ন পাননি।
তাদের কঠোর ভাষ্য—“বিএনপি আমাদের সঙ্গে মীর জাফর চরিত্র পুনরাবৃত্তি করেছে।”

বড় ধাক্কা: লেবার পার্টির সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা

ঝালকাঠি-১ আসনে নিজের প্রার্থী দেওয়ার পর বাংলাদেশ লেবার পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে।

তাদের জাতীয় নির্বাহী কমিটির বক্তব্য—‘১৭ বছরের মিত্রতার প্রতিদান বিএনপি দিয়েছে অবজ্ঞা ও বঞ্চনা দিয়ে।”

জমিয়তের ক্ষোভ, তবে দরজা এখনো খোলা

বিএনপির অন্যতম শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে বাংলাদেশ দশটি আসনে ছাড় চাইছে। আসনগুেলা হচ্ছে সিলেট-৫, সিলেট-৪, সিলেট-৬, সুনামগঞ্জ-২, সুনামগঞ্জ-৪, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, নারায়ণগঞ্জ-৪, নীলফামারী-১, চট্টগ্রাম-৫, নড়াইল-২।

কিন্তু বিএনপি দিতে চাইছে চারটি আসন। সেগুলো হচ্ছে সিলেট-৫ – উবায়দুল্লাহ ফারুক, নীলফামারী-১ – মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ – জুনায়েদ আল হাবীব, নারায়ণগঞ্জ-৪ – মনির হোসেন কাসেমী।

দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী ৩৬ নিউজকে বলেন, বিএনপির জমিয়তের জন্যই আসন খালি রেখেছে। আমাদের কাঙ্খিত আসনগুলো ইনশাআল্লাহ আমরা পাবো, সে আশা আমরা এখনো রাখছি।’

১২ দলীয় জোটের বিস্ময়: ‘ভরসা ভেঙে দিল বিএনপি’

১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক মোস্তফা জামাল হায়দারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নেতারা বলেন—‘তারেক রহমান শরিকদের অংশীদারিত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২৭২ আসনে একক মনোনয়ন দিয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন।’

জোট আরও জানিয়েছে—ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে তারা সোমবার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘোষণা দেবে।

বিএনপি কি ভুল পথে হাঁটছে? — বিশ্লেষকদের মন্তব্য

সাম্প্রতিক মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় শরিকদের বঞ্চিত করায় বিএনপি একটি কৌশলগত ভুলের দিকে এগোচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আন্দোলন, নির্বাচন ও গণমিছিল-হরতালে শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা বিএনপির পাশে ছিল। কিন্তু এবার তাদের উপেক্ষা করায় মাঠের মূল শক্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।

অনেক বিশ্লেষকের ভাষায়, ‘যারা ঝড়ঝাপ্টা সামলে বিএনপির পক্ষে রাস্তায় থেকেছে, তারাই যদি বঞ্চিত হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে হতাশা বাড়বে এবং তারা বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থানের দিকেও ঝুঁকতে পারে।’

একজন সিনিয়র রাজনৈতিক গবেষক বলেন, ‘বিএনপি যদি শরিকদের মতামত, পরামর্শ ও আন্দোলনের ভূমিকা মূল্যায়ন না করে, তাহলে ভবিষ্যতে কেউ আর জোটে বিশ্বাস রেখে পাশে দাঁড়াতে চাইবে না। এটি দীর্ঘমেয়াদে বিরোধী রাজনীতির জন্য নেতিবাচক।’

সামনে আরও বিচ্ছেদের সম্ভাবনা?

জমিয়ত, এনপিপি, জাতীয় দল—এরা এখনো জোট ছাড়েনি। কিন্তু ক্ষোভ স্পষ্ট।
বিএনপি যদি আলোচনায় না বসে বা আসন সমঝোতা না বাড়ায়, তারা বিকল্প পথ নিতে পারে যেকোনো সময়।

মনোনয়ন বিতরণে শরিকদের বঞ্চনায় বিএনপির জোট রাজনীতি গুরুতর সংকটে পড়েছে। লেবার পার্টির বিচ্ছেদ ইতোমধ্যেই বড় আঘাত। অন্য শরিকরা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলেও ক্ষোভ জমা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন—এই মনোনয়ন কৌশল কি নির্বাচনের আগেই বিএনপিকে দুর্বল করে ফেলছে? এভাবে শরিকদের বঞ্চনা কি বিএনপিকে ভুল পথে ঠেলে দিচ্ছে?’

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222